খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালমেসির সামনে ইংল্যান্ড! ইতিহাস, ফকল্যান্ড যুদ্ধ ও সেমিফাইনালের মহালড়াই বিশ্লেষণ

মেসির সামনে ইংল্যান্ড! ইতিহাস, ফকল্যান্ড যুদ্ধ ও সেমিফাইনালের মহালড়াই বিশ্লেষণ

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয় পেলেও আর্জেন্টিনার খেলা খুব একটা আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারেনি। দলের রক্ষণভাগে দুর্বলতা, মাঝমাঠে ছন্দহীনতা এবং আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট ছিল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই মানেই উত্তেজনা, ইতিহাস এবং আবেগের এক অনন্য মিশেল। মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের বাইরেও এই দুই দেশের মুখোমুখি হওয়া বহন করে কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া-ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আটলান্টায় অনুষ্ঠিতব্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স দেখে সমর্থকদের মনে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কিছুটা উদ্বেগও।

অনেকেই মনে করেন, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির মূল কারণ। বাস্তবে ফুটবল মাঠে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার বৈরিতার সূচনা আরও আগে, ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে।

সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখান জার্মান রেফারি। সিদ্ধান্তে বিস্মিত রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশি সহায়তায় তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ইংল্যান্ডের কোচ আল্ফ র‌্যামসে তাঁকে ‘পশু’ বলে মন্তব্য করেন, যা আর্জেন্টিনার কাছে ছিল গভীর অপমান এবং বর্ণবাদী আচরণের প্রতীক।

এই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ক চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নেয়।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে পরাজিত হয় আর্জেন্টিনা এবং শত শত আর্জেন্টাইন সেনা প্রাণ হারান।

চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেই ক্ষতের প্রতীকী জবাব দেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং এরপর ছয়জনকে কাটিয়ে করা ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ।

আরও পড়ুন :  ২০২৭ সালে পৃথিবী বদলে দিতে পারে এল নিনো! কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?

অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থকের কাছে সেই ম্যাচ ছিল কেবল একটি জয় নয়; বরং জাতীয় আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রতীক।

বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের নেতা লিওনেল মেসি। বয়স ৩৯ ছুঁলেও তাঁর ওপরই নির্ভর করছে দলের সবচেয়ে বড় আশা।

তবে প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান ফর্ম নিয়ে কি ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব?

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয় পেলেও আর্জেন্টিনার খেলা খুব একটা আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারেনি। দলের রক্ষণভাগে দুর্বলতা, মাঝমাঠে ছন্দহীনতা এবং আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট ছিল।

৩-১ ব্যবধানে জয় দেখলে মনে হতে পারে আর্জেন্টিনা সহজেই সেমিফাইনালে উঠেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মেসির কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেডে দ্রুত এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর সুইজারল্যান্ড ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে এবং দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ এক আক্রমণ থেকে সমতা ফেরায়।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে সুইসদের গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিছু সময়ের জন্য ম্যাচে আর্জেন্টিনা চাপে পড়ে যায়।

ম্যাচের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড এমবোলোকে লাল কার্ড দেখানো।

প্রথমে রেফারি আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখালেও পরে ভিএআরের সাহায্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।

আরও পড়ুন :  বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফিরল থ্রি লায়ন্স, বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে রোমাঞ্চ

এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন। তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভারসাম্য নষ্ট করেছে এবং ফুটবলের স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই।

ম্যাচ চলাকালীন একটি মুহূর্তে মাঠের মাইক্রোফোনে শোনা যায়, মেসি রেফারিকে বলছেন,

“আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আমি আপনাকে অসম্মান করিনি।”

যদিও পরে রেফারি ও মেসির মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধের খবর পাওয়া যায়নি, তবুও ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।

সুইজারল্যান্ড দশজনের দলে পরিণত হওয়ার পর জুলিয়ান আলভারেজ যে গোলটি করেন, সেটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দূরপাল্লার নিখুঁত শট এবং অসাধারণ ফিনিশিংয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেন।

এই গোলটি শুধু ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেনি, বরং দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।

সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বদলি হিসেবে নেমে লাউতারো মার্টিনেজের গোল পাওয়া।

দীর্ঘ সময় গোলের খরা কাটিয়ে তাঁর স্কোরশিটে ফেরার ঘটনা কোচ লিওনেল স্কালোনির জন্য বড় স্বস্তির।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যদি মেসিকে একাধিক ডিফেন্ডার ঘিরে রাখে, তাহলে আলভারেজ, লাউতারো এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো খেলোয়াড়দের দায়িত্ব আরও বেড়ে যাবে।

ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি দলের সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আর্জেন্টিনা বরাবরই চাপের মুখে নিজেদের সেরাটা খেলতে অভ্যস্ত।

আরও পড়ুন :  দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের আগে ৭ কেজি স্বর্ণসহ আটক-১

তাঁর মতে, এই দল কখনও সহজ ম্যাচে নিজেদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখায় না। বরং কঠিন পরিস্থিতিই খেলোয়াড়দের আরও মনোযোগী করে তোলে।

ইংল্যান্ডের বর্তমান দল অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। হ্যারি কেন, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা ও ফিল ফোডেনের মতো তারকারা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে দিতে পারেন।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিজ্ঞতা, দলগত সমন্বয় এবং মেসির নেতৃত্ব।

তবে কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ভুল করলে ইংল্যান্ড সেই সুযোগ হাতছাড়া করবে না। বিশেষ করে রক্ষণভাগের ছোট ভুলও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ কখনোই শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ, গৌরব এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক।

১৯৬৬ সালের বিতর্ক, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার অবিস্মরণীয় প্রতিশোধ—সবকিছু মিলিয়ে এই লড়াই এক অনন্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

এবার সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ লিওনেল মেসিদের সামনে। তবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পাওয়া সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইংল্যান্ডকে হারাতে হলে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের সেরা ফুটবলটাই খেলতে হবে। ইতিহাস, আবেগ কিংবা অতীতের স্মৃতি নয়—শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মাঠের পারফরম্যান্সই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ