বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আবারও খারাপ আবহাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়া ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনায় দেশের চারটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় অবস্থান করা স্থল নিম্নচাপটি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। তবে এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকা এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে ঝোড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের সাতটি অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টিও হতে পারে। ফলে আজ শনিবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, নিম্নচাপ দুর্বল হলেও তার প্রভাবে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি থাকায় সমুদ্রগামী নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলারগুলোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
সমুদ্রে আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় ছোট নৌযানগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝাড়খণ্ড ও তৎসংলগ্ন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় থাকা স্থল নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে সরে গিয়ে দুর্বল হয়েছে। বর্তমানে এটি ওই এলাকার কাছাকাছি সুস্পষ্ট লঘুচাপ হিসেবে অবস্থান করছে।
লঘুচাপটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং ক্রমশ দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরাসরি নিম্নচাপের শক্তি কমে গেলেও এর প্রভাব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে দমকা বা ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
অর্থাৎ নিম্নচাপ দুর্বল হওয়ায় বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু উপকূল ও নদীবন্দর এলাকায় স্থানীয়ভাবে ঝড়ো আবহাওয়া তৈরি হতে পারে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সাতটি অঞ্চলের জন্য আলাদা সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব এলাকায় ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে।
বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে খোলা জায়গায় অবস্থানকারী মানুষ এবং যানবাহন চলাচলকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বজ্রবৃষ্টির সময় গাছের নিচে, বিদ্যুতের খুঁটির পাশে কিংবা খোলা মাঠে অবস্থান না করার পরামর্শ মেনে চলা নিরাপদ। শহরাঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার সময় দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এবং গাছপালার কাছাকাছি অবস্থান করাও বিপজ্জনক হতে পারে।
শনিবার সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ছয় ঘণ্টার জন্য ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ অস্থায়ীভাবে মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে।
এ সময় বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।
দিনের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও গরম পুরোপুরি কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বৃষ্টির আগে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে পারে।
শনিবার সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮৭ শতাংশ। আগের দিন ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ মিলিমিটার।
শুধু সমুদ্রবন্দর নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্যও সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে।
এসব এলাকায় দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টিও হতে পারে।
এ কারণে এসব অঞ্চলের নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোর জন্য এমন আবহাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে ছোট নৌকা, যাত্রীবাহী নৌযান ও মাছ ধরার নৌকাকে ঝড়ের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল থাকায় জেলেদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
সমুদ্রে ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে ঢেউয়ের উচ্চতা বাড়তে পারে। ফলে ছোট নৌযানগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে না যাওয়াই নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও লঘুচাপের প্রভাবে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি সিস্টেম দুর্বল হওয়ার পরও তার প্রভাব কয়েকটি এলাকায় থেকে যেতে পারে।
বৃষ্টি হলে দিনের তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে আসতে পারে। তবে একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হলে মানুষের ভোগান্তিও বাড়তে পারে।
ঢাকায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টি হলেই অনেক সড়কে পানি জমে যায়। এর সঙ্গে যদি ঝোড়ো বাতাস ও বজ্রবৃষ্টি যোগ হয়, তাহলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ঝোড়ো হাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়া, গাছের ডাল ভেঙে পড়া বা দুর্বল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই আবহাওয়া খারাপ হলে অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়াই নিরাপদ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ঢাকায় সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে। পরদিন রোববার সূর্যোদয় হবে ভোর ৫টা ৩৪ মিনিটে।
তবে মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের দেখা নাও মিলতে পারে।
বর্তমানে যে স্থল নিম্নচাপটি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলছে, সেটি দুর্বল হয়ে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর প্রভাবে উপকূল ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টির আশঙ্কা এখনও রয়েছে।
তাই সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীবন্দরগুলোতেও সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজকের দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে আজ শনিবার বাংলাদেশের আবহাওয়ার মূল বার্তা হলো উপকূলে সতর্কতা, নদীপথে সাবধানতা এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির প্রস্তুতি। সমুদ্রযাত্রী, জেলে, নৌযানের চালক এবং সাধারণ মানুষকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

