বন্ধ ৩ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু হচ্ছে
দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা দেশের তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে দিয়ে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) সঙ্গে দুটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর চুক্তি হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় তিনটি পাটকলে মোট প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিজেএমসি এবং পাটকলগুলোর দায়িত্ব নেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা তিনটি পাটকলকে নতুন ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পুনরায় চালু করাই এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। চুক্তি অনুযায়ী সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড এবং খুলনার স্টার জুট মিলস লিমিটেডের লিজ পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। অন্যদিকে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস লিমিটেডের দায়িত্ব নিয়েছে হ্যামকো গ্রুপ।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বিজেএমসির পক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কবির উদ্দিন সিকদার এতে স্বাক্ষর করেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পক্ষে কোম্পানি সচিব আমিনুর রহমান এবং হ্যামকো গ্রুপের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম মোস্তফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
সরকারের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পাটকলগুলোতে আবারও শিল্প উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবারও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
চুক্তির আওতায় তিনটি পাটকল পুনরায় চালু করতে মোট প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি মিলের জন্য পৃথক বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগের অর্থ মূলত মিলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের রায়পুরে অবস্থিত জাতীয় জুট মিলস লিমিটেডে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মিলটি আবার চালু হলে সেখানে প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি মিলটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনার দিঘলিয়ায় অবস্থিত স্টার জুট মিলস লিমিটেডের জন্য বিনিয়োগ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। তিনটি পাটকলের মধ্যে এই মিলটিতে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু হলে এখানেও প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান হতে পারে। মিলটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
অপরদিকে, খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস লিমিটেডে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় মিলটি পুনরায় চালু হলে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই মিলের সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে তিনটি পাটকল চালু হলে সরাসরি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। একই সঙ্গে এসব মিলকে কেন্দ্র করে কাঁচা পাট সরবরাহ, পরিবহন, প্যাকেজিং, যন্ত্রপাতি, শ্রমিক পরিবহনসহ বিভিন্ন সহায়ক খাতেও কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে নতুন ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনটি মিলের এই চুক্তিকে সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেএমসির আওতাধীন উৎপাদন বন্ধ থাকা মোট ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি মিলকে পর্যায়ক্রমে ইজারার মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে ১৪টি মিলের লিজ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। লিজ চুক্তি শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এসব মিলের দখল হস্তান্তরও করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি পাটকলে ইতোমধ্যে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে অন্য মিলগুলোর লিজ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে উৎপাদনমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প খাতে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনটি পাটকল চালু হলে কমপক্ষে ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এই সংখ্যা শুধু তিনটি মিলের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানকে নির্দেশ করছে। এর বাইরে পাটকলকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সহযোগী ব্যবসা ও সেবা খাতেও অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ ও খুলনায় বড় আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। মিলের শ্রমিক, কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদাও বাড়তে পারে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরিবহন ও সরবরাহ খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে কাঁচা পাট সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলগুলোর যোগাযোগ বাড়বে। উৎপাদন চালু রাখতে নিয়মিত কাঁচামালের প্রয়োজন হওয়ায় পাট সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও নতুন গতি আসতে পারে।
দেশের অর্থনীতি ও কৃষির সঙ্গে পাটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পাটকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থাপনায় বন্ধ পাটকলগুলো চালু হলে শুধু প্রচলিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারলে এসব মিল থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উৎপাদনের মান নিশ্চিত করা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার নানা জটিলতা এবং আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার কৌশল নিয়েছে সরকার।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এবং বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বিজেএমসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং তিনটি পাটকলের লিজ নেওয়া প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও হ্যামকো গ্রুপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
তথ্য সূত্র: বাসস

