কুষ্টিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শহরের শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামের সামনে অবস্থিত এই স্মৃতিস্তম্ভে সোমবার (১০ আগস্ট) গভীর রাতে আগুন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়। ভিডিওটিতে এক ব্যক্তিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য দিতে এবং রাজনৈতিক স্লোগান দিতে শোনা যায়। একই সঙ্গে তাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়। ভিডিওতে স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি বহনকারী একটি স্থাপনায় এমন অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার দুপুরে খবর পেয়ে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার সরকার, কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অগ্নিসংযোগের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিও তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে অগ্নিসংযোগের আগে ও পরে ওই এলাকায় কারা অবস্থান করছিলেন, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বিষয়টি দেখেছেন কি না এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আলমাস হোসেন ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার কথা তারা আগেই জানতে পেরেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশকেও আগে অবহিত করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
আলমাস হোসেনের দাবি, সতর্ক করার পরও শেষ পর্যন্ত স্মৃতিস্তম্ভে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তার মতে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মকাণ্ড নয়; এর পেছনে পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সময়ে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি স্থানীয়ভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি বহনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। ফলে সেখানে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে সাধারণ অগ্নিসংযোগের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না আন্দোলন-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ওই সময়ের আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনার ওপর আঘাত করার চেষ্টা করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা সবকিছু যাচাই করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছে এবং ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার গভীর রাতে স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে আগুনে স্মৃতিস্তম্ভের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো ধরনের গুজব বা যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত না করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিসংযোগের প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কারা ছিলেন, তা বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হবে না এবং জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার পর কুষ্টিয়ায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নগুলোর সুরক্ষা, রাতের নিরাপত্তা এবং নজরদারি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সংঘাতের আশঙ্কা থাকলে এসব স্থাপনায় অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

