খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালঅমিত শক্তির শৈল্পিক প্রকাশের সূর্যসারথি এস এম সুলতান

অমিত শক্তির শৈল্পিক প্রকাশের সূর্যসারথি এস এম সুলতান

দীর্ঘ বোহেমিয়ান জীবন কাটানোর পর এস এম সুলতান অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এস এম সুলতান এমন এক নাম, যাঁকে শুধু একজন শিল্পী হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির গভীরতা বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন বাংলার মাটি, কৃষক, শ্রম, নদী, প্রকৃতি ও গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রামের এক অনন্য শিল্পভাষ্যকার। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক কখনো অসহায় কিংবা করুণ চরিত্র হয়ে ওঠেনি। বরং বিশাল দেহ, শক্তিশালী পেশি এবং দৃঢ় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে কৃষককে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজ ও সভ্যতার মূল নির্মাতা হিসেবে।

শিল্পের এই নিজস্ব ভাষাই এস এম সুলতানকে বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর শিল্পকর্মে যেমন গ্রামীণ জীবনের প্রাণপ্রাচুর্য রয়েছে, তেমনই রয়েছে শ্রেণি, উৎপাদন, ভূমি, শ্রম ও মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। তাই এস এম সুলতানের শিল্প শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি একই সঙ্গে ইতিহাস ও সমাজের দলিল।

নড়াইলের মাটিতে জন্ম ‘লাল মিয়া’র

এস এম সুলতানের পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি এবং মা মাজু বিবি। ছোটবেলায় পরিবারের আদরের নাম ছিল ‘লাল মিয়া’। পরবর্তী সময়ে এই নামেই তিনি নড়াইলবাসীর কাছে ব্যাপক পরিচিত হয়ে ওঠেন।

শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। দারিদ্র্যের কারণে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন খুব বেশি দূর এগোয়নি। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু চারপাশের মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনের নানা দৃশ্য তাঁর কিশোর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

শৈশবেই তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। স্থানীয় জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি এঁকে তিনি সবাইকে বিস্মিত করেছিলেন। তাঁর আঁকার প্রতিভা দেখে স্থানীয় অভিজাত মহলেও আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহই পরবর্তীতে তাঁকে নড়াইল থেকে কলকাতার দিকে নিয়ে যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে শিল্পের সন্ধানে

১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে এস এম সুলতান কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় শিল্পসমালোচক ও সংস্কৃতিবিদ শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। সুলতানের প্রতিভা বুঝতে পেরে সোহরাওয়ার্দী তাঁকে উৎসাহ দেন এবং তাঁর সহায়তায় কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ার সুযোগ পান।

তবে সুলতানের শিল্পীজীবন কখনোই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিল্পের ভাষা তৈরি করতে চেয়েছেন। শিল্পের একাডেমিক কাঠামো তাঁকে যতটা প্রভাবিত করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে মানুষের জীবন ও প্রকৃতি।

কলকাতা আর্ট স্কুল ছাড়ার পর তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন। সেখানকার মানুষ, প্রকৃতি ও জীবিকার নানা দৃশ্য তাঁর শিল্পচিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

দেশ-বিদেশে প্রদর্শনী ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি

এস এম সুলতানের শিল্পীজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় তাঁর প্রথম দিকের একক প্রদর্শনীর মাধ্যমে। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি ভারতের সিমলায় তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে লাহোরেও তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছিলেন ফাতিমা জিন্নাহ।

আরও পড়ুন :  শান্তি বৈঠকের পরই হামলা! হরমুজে আগুন, ফের মুখোমুখি ইরান ও আমেরিকা

এরপর তাঁর শিল্পের পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক চিত্রশিল্পীদের সম্মেলনে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।

এই সময় তাঁর ছবির সঙ্গে সমকালীন বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের শিল্পকর্মও প্রদর্শিত হয়েছিল। পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, পল ক্লি, মাতিস, ডুফিসহ বিখ্যাত শিল্পীদের পাশে এস এম সুলতানের কাজ প্রদর্শিত হওয়া তাঁর আন্তর্জাতিক শিল্পী পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

বিশেষ করে এশিয়ার একজন শিল্পী হিসেবে সেই পর্যায়ে ইউরোপীয় শিল্পপরিসরে তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেলেও তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে এসেছেন।

কেন কৃষক হয়ে উঠলেন সুলতানের ছবির নায়ক

এস এম সুলতানের শিল্পকে বুঝতে হলে তাঁর কৃষকচিত্রকে বুঝতে হবে। বাংলার কৃষক তাঁর কাছে নিছক শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন না। কৃষক ছিলেন সভ্যতার নির্মাতা।

প্রচলিত শিল্পে দরিদ্র মানুষকে অনেক সময় দুর্বল, ক্ষুধার্ত কিংবা বঞ্চিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সুলতান সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। তাঁর কৃষক শক্তিশালী। তাঁর শরীর বিশাল। তাঁর পেশিতে শ্রমের শক্তি। তাঁর হাতে উৎপাদনের ক্ষমতা।

ধান কাটা, জমি কর্ষণ, ধান মাড়াই, মাছ ধরা কিংবা নদী পারাপারের দৃশ্যের মধ্যে তিনি কৃষকের শরীর ও শ্রমকে এক ধরনের মহিমা দিয়েছেন।

এ কারণেই তাঁর ছবির কৃষক শুধু একটি চরিত্র নয়। সে বাংলার অর্থনীতি, সমাজ ও সভ্যতার কেন্দ্রীয় শক্তির প্রতীক।

গ্রামীণ জীবন ও শ্রেণিসংঘাতের শিল্পী

সুলতানের ছবিতে গ্রাম মানেই শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতির ছবি নয়। তাঁর গ্রামে আনন্দ যেমন আছে, তেমনই আছে সংগ্রাম। রয়েছে জমি, উৎপাদন, মালিকানা, শ্রম ও টিকে থাকার লড়াই।

‘চর দখল’-এর মতো কাজের মধ্যে গ্রামীণ সমাজের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। নদীর বুকে জেগে ওঠা একটি চর শুধু নতুন জমি নয়; সেটি মানুষের জীবিকা ও মালিকানার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্পদ। ফলে সেই জমিকে ঘিরে তৈরি হয় সংঘাত।

সুলতান তাঁর ছবিতে এই বাস্তবতাকে সরাসরি কিংবা প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর শিল্পে গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামো এবং শ্রমজীবী মানুষের অবস্থান তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নারীও তাঁর শিল্পে শ্রমের অংশ

সুলতানের শিল্পে নারীও কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। তাঁর নারী চরিত্রগুলো শক্তিশালী এবং শ্রমজীবী। কৃষিকাজ ও উৎপাদনের সঙ্গে নারীর ভূমিকার বিষয়টিও তাঁর ছবিতে ফুটে ওঠে।

তাঁর নারীচরিত্রের শরীরেও রয়েছে শক্তির প্রকাশ। এটি নিছক শারীরিক সৌন্দর্য দেখানোর চেষ্টা নয়। বরং শ্রম, জীবনধারণ এবং উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের শক্তিকে তিনি শিল্পের বিষয় করেছেন।

এই জায়গাতেই সুলতানের শিল্প প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের বাইরে গিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে।

১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে নতুন অধ্যায়

আন্তর্জাতিক শিল্পজগত ঘুরে দেখার পর ১৯৫৩ সালে এস এম সুলতান নড়াইলে ফিরে আসেন। তাঁর এই ফিরে আসা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি চাইলে শহুরে শিল্পজগতের সঙ্গে থেকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আরও এগিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল নিজের মাটির মানুষ এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করার দিকে।

আরও পড়ুন :  ৮৬ মৌজা নিলামে বিক্রি করেও ফেরাতে হয়েছিল! পঞ্চকোট রাজপরিবারের অজানা ইতিহাস

নড়াইলে ফিরে তিনি শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলা শিক্ষার উদ্যোগ নেন। শিল্পকে কেবল গ্যালারি কিংবা অভিজাত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

১৯৬৯ সালে তিনি ‘দ্য ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন ‘শিশুস্বর্গ’। তাঁর কাছে শিশুরা ছিল ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণের শক্তি।

শিল্পের বাইরেও ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী

এস এম সুলতানের জীবন শুধু ক্যানভাস আর রঙের মধ্যে আটকে ছিল না। তিনি প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল ছিলেন।

বিভিন্ন পশুপাখি পোষার অভ্যাস ছিল তাঁর। সাপ, বানর, খরগোশ, পাখি, ষাঁড়সহ নানা প্রাণী তাঁর আশপাশে থাকত। প্রাণীদের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

ঢাকার ফুটপাত থেকে একটি দুর্লভ নাগালিঙ্গম গাছ কেটে ফেলার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছিল বলে জানা যায়। তাঁর কাছে একটি গাছ ধ্বংস হওয়া মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে একটি জীবনেরও অবসান ঘটে।

‘পাট কাটা’ থেকে ‘ধান মাড়াই’—ক্যানভাসে বাংলার জীবন

সুলতানের শিল্পকর্মের বিষয়বৈচিত্র্য বিস্তৃত হলেও বাংলার গ্রামীণ জীবন তাঁর শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। ‘পাট কাটা’, ‘ধান কাটা’, ‘ধান ঝাড়া’, ‘ধান ভানা’, ‘জলকে চলা’, ‘চর দখল’, ‘গ্রামের খাল’, ‘গ্রামের দুপুর’, ‘নদী পারাপার’, ‘ধান মাড়াই’, ‘জমি কর্ষণে যাত্রা’, ‘মাছ ধরা’, ‘নদীর ঘাটে’, ‘গুনটানা’, ‘ফসল কাটার ক্ষণে’, ‘শরতের গ্রামীণ জীবন’ ও ‘শাপলা তোলা’র মতো কাজের মধ্যে তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই ছবিগুলোতে মানুষ ও প্রকৃতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কৃষক যেমন জমির সঙ্গে যুক্ত, তেমনই নদী, ফসল, গাছপালা ও ঋতুচক্রও তাঁর শিল্পে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় সম্মান

বাংলাদেশের শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য এস এম সুলতান জীবদ্দশায় বহু সম্মাননা পেয়েছেন।

১৯৮২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে সম্মানিত হন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর অন্যতম স্বাধীনতা পদক পান।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক-এর ‘ম্যান অব এশিয়া’ স্বীকৃতিও তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির সাক্ষ্য বহন করে।

নড়াইলেই চিরনিদ্রায় শিল্পী

দীর্ঘ বোহেমিয়ান জীবন কাটানোর পর এস এম সুলতান অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর বাসভবন, শিশুস্বর্গ ও সমাধিস্থল ঘিরে গড়ে ওঠে ‘এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা’। তাঁর শিল্প ও জীবনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন :  অবশেষে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এস এম সুলতান আর্ট কলেজ, যা পরবর্তীতে এস এম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে শিশুদের জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সুলতানের স্মৃতি সংরক্ষণে এখনও চ্যালেঞ্জ

এস এম সুলতানের জীবন ও শিল্প নিয়ে আগ্রহ থাকলেও তাঁর স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী, শিল্পকর্ম এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

চিত্রা নদীর পাশে তাঁর ব্যবহৃত ‘ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ’ বা দ্বিতল নৌকাটিও তাঁর জীবন ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। নৌকাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করার প্রয়োজন রয়েছে।

একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর উত্তরাধিকার শুধু তাঁর আঁকা ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জীবনযাপন, দর্শন, শিক্ষা উদ্যোগ, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতাও তাঁর ঐতিহ্যের অংশ।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক এস এম সুলতান

এস এম সুলতানের মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর শিল্পের আবেদন কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর কাজ নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।

কারণ তিনি এমন এক বাংলাদেশকে এঁকেছেন, যে বাংলাদেশকে শহরের চকচকে জীবনের বাইরে খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর ছবিতে আছে মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম, নদীর স্রোত, ফসলের মাঠ এবং মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন কৃষক কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি ছোট অংশ নন। কৃষকই খাদ্য উৎপাদন করেন, সমাজকে টিকিয়ে রাখেন এবং সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করেন।

এই কারণেই এস এম সুলতানের শিল্পকে শুধু নান্দনিকতার চোখে দেখলে তাঁর কাজের বড় একটি অংশ অদেখা থেকে যায়। তাঁর ছবির ভেতরে রয়েছে বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, ইতিহাস ও মানুষের শক্তির গল্প।

শিল্পের আকাশে আজও উজ্জ্বল সুলতানের সূর্য

এস এম সুলতান ছিলেন নিজের সময়ের চেয়ে অনেকটা আলাদা একজন শিল্পী। আন্তর্জাতিক শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়েও তিনি নিজের শিকড় ভুলে যাননি। বরং বিশ্বকে দেখেছেন, তারপর নিজের মাটির কাছে ফিরে এসে সেই মাটিকেই তাঁর শিল্পের প্রধান বিষয় করেছেন।

তাঁর কৃষক, কৃষাণী, শ্রমিক, শিশু, নদী ও প্রকৃতি আজও আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রাখে—সমাজের আসল নির্মাতা কারা?

এই প্রশ্নের উত্তরই যেন তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসে।

এস এম সুলতান তাই শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন। তিনি বাংলার কৃষকজীবনের একজন শিল্প-ইতিহাসকার, শ্রমের সৌন্দর্যের এক অনন্য নির্মাতা এবং মানুষের শক্তিকে ক্যানভাসে তুলে ধরা এক অসাধারণ শিল্পী।

নড়াইলের সেই ‘লাল মিয়া’ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর তুলির আঁচড়ে যে কৃষক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যে মানুষ মাটিকে চাষ করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেই মানুষ আজও জীবন্ত।

আর সেখানেই এস এম সুলতানের সবচেয়ে বড় সাফল্য—তিনি চলে গিয়েও তাঁর মানুষগুলোকে আমাদের সামনে রেখে গেছেন।

লেখক: রিফাত-বিন-ত্বহা, সিনিয়র সাংবাদিক।

আর্কাইভ