খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশনতুন পতঙ্গভুক গাছের সন্ধান! ১৫০ বছর আগে ডারউইনের অনুমান সত্যি প্রমাণ করলেন...

নতুন পতঙ্গভুক গাছের সন্ধান! ১৫০ বছর আগে ডারউইনের অনুমান সত্যি প্রমাণ করলেন বিজ্ঞানীরা

এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের কুনমিং ইনস্টিটিউট অব বটানি এবং ফ্লোরিডার আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি-র গবেষকরা। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications-এ।

চার্লস ডারউইনের একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান সত্যি হতে অপেক্ষা করতে হল দেড় শতাব্দী। ১৮৭৫ সালে তিনি ধারণা করেছিলেন, স্যাক্সিফ্রেগা (Saxifraga) গোত্রের কিছু উদ্ভিদ পতঙ্গভুক বা মাংসাশী হতে পারে। কিন্তু সে সময় প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সেই ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবশেষে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে— স্যাক্সিফ্রেগা ক্যান্ডেলাব্রাম (Saxifraga candelabrum) সত্যিই একটি পতঙ্গভুক উদ্ভিদ।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কার শুধু ডারউইনের তত্ত্বকেই সত্য প্রমাণ করেনি, উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণায়ও নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

১৮৭৫ সালে চার্লস ডারউইন লক্ষ্য করেছিলেন, স্যাক্সিফ্রেগা রোটুন্ডিফোলিয়া এবং স্যাক্সিফ্রেগা আমব্রোসা প্রজাতির গাছের পাতায় আঠালো গ্রন্থিযুক্ত সূক্ষ্ম রোম রয়েছে। তাঁর ধারণা ছিল, এই আঠালো অংশে পোকামাকড় আটকে যায় এবং হয়তো গাছটি সেখান থেকে পুষ্টিও সংগ্রহ করে।

তবে শুধু পোকা আটকে ফেলাই কোনও গাছকে পতঙ্গভুক করে তোলে না। প্রকৃত পতঙ্গভুক উদ্ভিদকে শিকার হজম করে তার থেকে নাইট্রোজেন ও অন্যান্য পুষ্টি গ্রহণ করতে হয়। সেই প্রমাণ ডারউইনের সময় পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন :  গরুর মাংসের শুঁটকি: হারিয়ে না যাওয়া এক ঐতিহ্যবাহী স্বাদের গল্প

সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে স্যাক্সিফ্রেগা ক্যান্ডেলাব্রাম একটি প্রকৃত পতঙ্গভুক উদ্ভিদ।

এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের কুনমিং ইনস্টিটিউট অব বটানি এবং ফ্লোরিডার আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি-র গবেষকরা। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications-এ।

এই বিশেষ প্রজাতির স্যাক্সিফ্রেগা জন্মায়—

চীনের ইউনান প্রদেশ
সিচুয়ান প্রদেশ
হেংডুয়ান পর্বতমালা
শিনহাই-তিব্বত মালভূমির দক্ষিণাঞ্চল

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,২০০ থেকে ১০,৮০০ ফুট উচ্চতায়, পাথুরে ও পুষ্টিহীন জমিতে এই উদ্ভিদের দেখা মেলে।

গবেষণায় জানা গেছে, এই উদ্ভিদ একটি বিশেষ সুগন্ধ ছড়িয়ে মশা, মাছি এবং ছোট পতঙ্গকে আকর্ষণ করে।

এরপর পাতার গ্রন্থিযুক্ত আঠালো রোমে পতঙ্গ আটকে যায়। আটকে পড়ার পর গাছটি ফসফাটেজ (Phosphatase) নামের একটি বিশেষ এনজাইম নিঃসরণ করে। এই এনজাইমের সাহায্যে শিকারকে ধীরে ধীরে হজম করে গাছটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে।

স্যাক্সিফ্রেগা একটি সবুজ উদ্ভিদ। অর্থাৎ এটি সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন :  আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড: মেসির কর্নারে অ্যালিস্টারের হেডে দ্রুত গোল, দাপুটে সূচনা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের

তবুও এর পতঙ্গ শিকারের কারণ রয়েছে।

পাহাড়ের পাথুরে জমিতে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ খুবই কম থাকে। ফলে গাছটি মাটি থেকে পর্যাপ্ত নাইট্রেট সংগ্রহ করতে পারে না। এই ঘাটতি পূরণ করতেই পতঙ্গের শরীর থেকে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে।

ঠিক একই কৌশল অনুসরণ করে—

সূর্যশিশির (Sundew)
কলসপত্রী (Pitcher Plant)
ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ (Venus Flytrap)

সহ বিশ্বের অন্যান্য পরিচিত পতঙ্গভুক উদ্ভিদ।

গবেষকরা প্রথমে রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে গাছটির এনজাইমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন।

এরপর আইসোটোপ লেবেলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা হয়, পতঙ্গের শরীরে থাকা নাইট্রোজেন-১৫ আইসোটোপ গাছের শরীরে প্রবেশ করছে কি না।

ফলাফলে স্পষ্ট দেখা যায়, শিকার হওয়া পতঙ্গের নাইট্রোজেন গাছের শরীরে শোষিত হচ্ছে। অর্থাৎ গাছটি শুধু পতঙ্গ আটকে রাখে না, সেগুলো হজম করেও পুষ্টি সংগ্রহ করে।

এর উত্তর হলো— না।

স্যাক্সিফ্রেগা গোত্রে প্রায় ৪৭০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। অনেক প্রজাতির পাতায় একই ধরনের আঠালো গ্রন্থিযুক্ত রোম দেখা গেলেও, সব গাছই পতঙ্গভুক নয়।

আরও পড়ুন :  মেয়েদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুললে কী করবেন?

অনেক সময় এই আঠালো পদার্থ কেবল আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই প্রতিটি প্রজাতির ক্ষেত্রে আলাদা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষক দলের প্রধান এবং কুনমিং ইনস্টিটিউট অব বটানির অধ্যাপক হ্যাং সান জানিয়েছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে আরও অজানা পতঙ্গভুক উদ্ভিদ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে এমন বহু উদ্ভিদ থাকতে পারে, যাদের পতঙ্গভুক বৈশিষ্ট্য এখনও বিজ্ঞানীদের অজানা। নতুন গবেষণা সেই রহস্য উন্মোচনের পথ আরও সহজ করবে।

চার্লস ডারউইনের দূরদর্শী বৈজ্ঞানিক চিন্তা আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে অবশেষে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। স্যাক্সিফ্রেগা ক্যান্ডেলাব্রাম-এর পতঙ্গভুক বৈশিষ্ট্যের আবিষ্কার শুধু একটি নতুন উদ্ভিদের পরিচয়ই দেয়নি, বরং উদ্ভিদের অভিযোজন, বিবর্তন এবং পুষ্টি সংগ্রহের কৌশল সম্পর্কে বিজ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে এই গবেষণার হাত ধরে আরও নতুন পতঙ্গভুক উদ্ভিদের সন্ধান মিলতে পারে বলেই আশাবাদী বিজ্ঞানীরা।

আর্কাইভ