খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeইতিহাস-ঐতিহ্যব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের স্টেডিয়াম থেকে গণহত্যার মঞ্চ: এস্তাদিও নাসিওনালের রক্তাক্ত ইতিহাস

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের স্টেডিয়াম থেকে গণহত্যার মঞ্চ: এস্তাদিও নাসিওনালের রক্তাক্ত ইতিহাস

বিশ্বকাপের গৌরবময় স্মৃতির মাত্র ১১ বছর পর চিলি প্রবেশ করে রাজনৈতিক সংকটের এক অন্ধকার সময়ে। ১৯৭৩ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সালভাদোর আলেন্দে। তাঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু স্টেডিয়াম আছে, যেগুলো শুধু খেলাধুলার জন্য নয়, বরং একটি জাতির সুখ-দুঃখ, গৌরব ও ট্র্যাজেডির সাক্ষী হিসেবেও পরিচিত। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে অবস্থিত এস্তাদিও নাসিওনাল ঠিক তেমনই একটি স্থান। একদিকে এই মাঠে উদযাপিত হয়েছে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে একই স্টেডিয়াম পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক বন্দিশালা ও গণহত্যার ভয়ংকর কেন্দ্রে।

এস্তাদিও নাসিওনাল: ফুটবল ঐতিহ্যের গর্ব

চিলির সবচেয়ে বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে এস্তাদিও নাসিওনালের নাম সবার আগে আসে। বহু আন্তর্জাতিক ম্যাচ, জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ লড়াই এবং অসংখ্য স্মরণীয় ফুটবল মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে এই মাঠ।

১৯৬২ সালে চিলিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপ। সেই আসরে ব্রাজিল ছিল অন্যতম শক্তিশালী দল। বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি পেলে ছিলেন দলের প্রধান ভরসা। টুর্নামেন্টের শুরুটা দুর্দান্ত করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, পেলেকে ছাড়া ব্রাজিলের শিরোপা জয় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কিন্তু ব্রাজিল দল ভেঙে পড়েনি। বরং গ্যারিঞ্চার অসাধারণ নৈপুণ্যে দলটি এগিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠে চেকোশ্লোভাকিয়ার মুখোমুখি হয় সেলেকাওরা। ফাইনালের মঞ্চ ছিল এস্তাদিও নাসিওনাল।

ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের স্মরণীয় অধ্যায়

ফাইনালে শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। তবে তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। গ্যারিঞ্চা ও তার সতীর্থদের দাপটে চেকোশ্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল।

আরও পড়ুন :  ইংল্যান্ডের জন্য ধাক্কা! রোনাল্ডোর দলের জন্য মাঠ ‘লক’ – কী বলছে FIFA নিয়ম?

সেদিন স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ৬৮ হাজারেরও বেশি দর্শক। তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিশ্ব ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সেই মুহূর্তে কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে কয়েক বছরের মধ্যেই এই আনন্দের মাঠ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীকে পরিণত হবে।

১৯৭৩: চিলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা

বিশ্বকাপের গৌরবময় স্মৃতির মাত্র ১১ বছর পর চিলি প্রবেশ করে রাজনৈতিক সংকটের এক অন্ধকার সময়ে। ১৯৭৩ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সালভাদোর আলেন্দে। তাঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চিলির সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করে। শুরু হয় সামরিক অভ্যুত্থান। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতা ও ভয়।

প্রেসিডেন্ট আলেন্দে দেশ ছাড়ার সুযোগ পেয়েও পিছু হটেননি। পরে রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদের মতে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

অভ্যুত্থানের পর চিলিতে শুরু হয় সামরিক শাসন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

ফুটবল স্টেডিয়াম থেকে বন্দিশালায় রূপান্তর

সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন শুরু করে। সেই সময় এস্তাদিও নাসিওনালকে ফুটবল মাঠ হিসেবে নয়, বরং একটি বিশাল বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে এই স্টেডিয়ামে নিয়ে আসা হয়েছিল। তারা ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিক। অনেককে কোনো বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়।

আরও পড়ুন :  পেলের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন! কীভাবে ভায়াগ্রার বিজ্ঞাপনে রাজি হয়েছিলেন ফুটবল সম্রাট?

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪১ জন মানুষকে এই স্টেডিয়ামে হত্যা করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তাদের মতে, শত শত মানুষ এখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

ভয়াবহ নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

এস্তাদিও নাসিওনালে আটক ব্যক্তিদের ওপর চালানো হয়েছিল নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দিনের পর দিন তাদের অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হয়।

অনেক বন্দিকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত সেখানে রাখা হয়েছিল। নির্যাতনের কারণে অসংখ্য মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়। অনেকেই আর কখনও পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের অনেকের মরদেহ পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কিছু মৃতদেহ রাস্তা, নদী বা গোপন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই কারণেই এস্তাদিও নাসিওনাল শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়, বরং চিলির ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক বেদনাদায়ক প্রতীক হয়ে ওঠে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যাচ বয়কট

গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যেই ১৯৭৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজন করা হয় এই স্টেডিয়ামে। প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা দেয়, তারা এমন একটি মাঠে খেলবে না যেখানে কিছুদিন আগেই রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।

আরও পড়ুন :  বিরতিতে ঝড়! জাস্টিন বিবার, শাকিরা ও BTS এক মঞ্চে দর্শকদের পাগল করা পারফরম্যান্স

ফলে তারা ম্যাচে অংশ নেয়নি। চিলি ফাঁকা মাঠে প্রতীকী গোল করে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে। ফুটবল ইতিহাসে এটি অন্যতম অদ্ভুত এবং বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে আজও আলোচিত।

আজও বহন করছে রক্তাক্ত স্মৃতি

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এস্তাদিও নাসিওনাল আবার ফুটবলের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চিলি জাতীয় দলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এই স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হয়।

তবে অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি মুছে যায়নি। গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার মানুষদের স্মরণে স্টেডিয়ামের একটি গেট এবং একটি স্ট্যান্ড উৎসর্গ করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের কথা জানতে পারেন।

স্থানীয়দের অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই স্টেডিয়ামের দেয়াল এখনও যেন অতীতের আর্তনাদ বহন করে। যদিও তা লোককথার অংশ, তবুও ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এস্তাদিও নাসিওনাল এমন একটি স্থান, যেখানে ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরব এবং মানব ইতিহাসের গভীরতম ট্র্যাজেডি একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের উল্লাস যেমন এই মাঠকে অমর করেছে, তেমনি ১৯৭৩ সালের সামরিক শাসনের সময় সংঘটিত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড এটিকে চিরকালীন বেদনার প্রতীকেও পরিণত করেছে।

আজ যখন হাজারো দর্শক এই মাঠে ফুটবল উপভোগ করেন, তখন স্টেডিয়ামের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—খেলার মাঠ কখনও কখনও শুধু ক্রীড়ার সাক্ষী নয়, বরং একটি জাতির সংগ্রাম, রক্তপাত এবং স্মৃতিরও নীরব ধারক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ