বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার গোলশূন্য ড্র ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেক ফুটবলপ্রেমীর দাবি, দুই দলই ইচ্ছাকৃতভাবে ড্র করার লক্ষ্য নিয়ে খেলেছে। এমনকি কেউ কেউ ম্যাচটিকে “বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিরক্তিকর ম্যাচ” বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
গ্রুপ ডি-র শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ে জানত, ড্র করলেই উভয় দলেরই নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে চার পয়েন্ট নিয়ে শেষ করতে পারলেই পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট প্রায় নিশ্চিত ছিল।
সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ০-০ গোলে ড্র হয়। ফলে গোল ব্যবধানের হিসেবে অস্ট্রেলিয়া গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করে। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে তৃতীয় হলেও সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউটে যাওয়ার দারুণ সুযোগ তৈরি করে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য দর্শক দুই দলের খেলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল না খেলে নিরাপদ ড্র নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছিল।
একজন সমর্থক মন্তব্য করেন, এটি বিশ্বকাপ তো বটেই, মানব ইতিহাসের অন্যতম বিরক্তিকর ফুটবল ম্যাচ।
আরেকজনের দাবি, দুই দল যেন আগেই সমঝোতায় পৌঁছেছিল যে কেউ জয়ের জন্য ঝুঁকি নেবে না।
আরও একজন লেখেন, “এই ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল ফল হবে ০-০। দুই দলই জানত ড্র করলেই সবাই খুশি।”
অনেকে আবার অভিযোগ করেন, এমন ম্যাচ বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতামূলক মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বিষয়টি তদন্ত করা উচিত।
কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলেন, “যদি দেখতে চান ২২ জন ফুটবলার কীভাবে গোল না করার চেষ্টা করে পুরো ম্যাচ খেলতে পারে, তাহলে এই ম্যাচই ছিল তার আদর্শ উদাহরণ।”
অনেক ফুটবল সমর্থক এই ম্যাচের সঙ্গে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের কুখ্যাত “ডিসগ্রেস অব গিজন” ঘটনার তুলনা টেনেছেন।
সেই আসরে পশ্চিম জার্মানি ১-০ গোলে অস্ট্রিয়াকে হারায়। ম্যাচের প্রথম দিকে গোল হওয়ার পর বাকি সময় দুই দলই প্রায় ঝুঁকিহীন ফুটবল খেলেছিল। সেই ফলেই উভয় দল নকআউটে উঠে যায় এবং আলজেরিয়া বাদ পড়ে। ঘটনাটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ হিসেবে এখনও স্মরণ করা হয়।
যদিও ম্যাচটি গোলশূন্য ছিল, তবুও প্রথমার্ধে তুলনামূলক ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
শুরুতেই জ্যাকসন আরভাইনের শট দারুণভাবে রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। বিরতির আগে ক্রিস্টিয়ান ভলপাতোর প্রচেষ্টাও প্রতিহত করেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখল কিছুটা বাড়ায় প্যারাগুয়ে। তবে দুই দলের কেউই উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
ম্যাচের ৯০ মিনিটে জর্ডান বস অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে ভালো সুযোগ পান। কিন্তু ডান দিক থেকে নেওয়া তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
অতিরিক্ত সময়ে প্যারাগুয়ের মাউরিসিওর দুর্বল শট সহজেই আটকে দেন অস্ট্রেলিয়ার গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ।
এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ টনি পপোভিচ শুরুর একাদশে ছয়টি পরিবর্তন আনেন।
সবচেয়ে আলোচনায় ছিলেন ১৮ বছর বয়সী লুকাস হ্যারিংটন। এমএলএস ক্লাব কলোরাডো র্যাপিডসের এই তরুণ ফুটবলার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে মাঠে নামেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী বিশ্বকাপ অভিষেককারী খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন।
ম্যাচে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার দিয়েগো গোমেজ। ফলে দল নকআউট পর্বে উঠলেও প্রথম ম্যাচে তাকে পাবে না প্যারাগুয়ে।
এটি দলের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে, কারণ গোমেজ মাঝমাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
অস্ট্রেলিয়া-প্যারাগুয়ের ড্রয়ের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্কটল্যান্ডের ওপর।
প্যারাগুয়ে সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর তালিকায় এগিয়ে যাওয়ায় স্কটল্যান্ডের শেষ ৩২-এ ওঠার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে গেছে। এখন তাদের অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে।
গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করায় অস্ট্রেলিয়া আগামী ৩ জুলাই টেক্সাসের আরলিংটনে গ্রুপ জি-র রানার্সআপ দলের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচ খেলবে।
অন্যদিকে প্যারাগুয়েকে অপেক্ষা করতে হবে অন্যান্য গ্রুপের ফলাফলের জন্য। তবে বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী তাদেরও নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।
ফুটবলে কৌশলগত খেলার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে যখন দুই দলই ঝুঁকি না নিয়ে শুধুমাত্র কাঙ্ক্ষিত ফল ধরে রাখার চেষ্টা করে, তখন ম্যাচের প্রতিযোগিতামূলক সৌন্দর্য প্রশ্নের মুখে পড়ে। অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের গোলশূন্য ড্র সেই বিতর্কই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও নিয়ম ভঙ্গের কোনো প্রমাণ নেই, তবুও ম্যাচটির মান এবং দুই দলের রক্ষণাত্মক কৌশল বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

