বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদান নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে অন্তত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতো না। তাঁর মতে, ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান ছিল অনস্বীকার্য ও অতুলনীয়। এ কারণে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শনিবার (১৫ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন সমালোচিত দিক নিয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেন।
আসিফ নজরুল তাঁর বক্তব্যে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর অনেক কারণ রয়েছে। তিনি আগে যেমন মনে করতেন, এখনও সেই অবস্থানে রয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে অন্তত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হতো না।
১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এই সময়ের আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য।
আসিফ নজরুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অবদানকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি দিকও তুলে ধরেছেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটি সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল।
আসিফ নজরুলের দাবি, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা ও অবস্থানের কিছু প্রতিফলন ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত গণপরিষদের বিতর্কের দলিলেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের কাঠামো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং মানুষের অধিকার নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, সেখানেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অবদান মূল্যায়নের পাশাপাশি তাঁর শাসনামলের সমালোচনাও করেছেন সাবেক এই আইন উপদেষ্টা।
আসিফ নজরুল বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন বাংলাদেশ পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, অর্থনৈতিক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তখন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়েছিল।
তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনায় দক্ষ ছিলেন না এমন সমালোচনা থাকলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের সামনে তখন একসঙ্গে অনেকগুলো বড় সংকট ছিল।
তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, যুদ্ধ-পরবর্তী নানা সংকট বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী শাসনব্যবস্থার সমালোচিত দিকগুলোকে বৈধতা দেয় না।
আসিফ নজরুল তাঁর ফেসবুক পোস্টে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের দুর্ভিক্ষ, নির্বিচারে হত্যার অভিযোগ এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, এসব বাস্তবতাকে কোনোভাবেই আড়াল করা যায় না।
তিনি মনে করেন, ১৯৭২ সালের পর বঙ্গবন্ধুর শাসন ধীরে ধীরে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার সমালোচনাও ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নয়, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কার সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডও বিবেচনায় নেওয়া উচিত—এমন অবস্থানই তুলে ধরেছেন আসিফ নজরুল।
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের কয়েক বছরের বিতর্কিত ও সমালোচিত অধ্যায় মনে রেখেও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে বহু মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন বলে উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।
নিজেকেও সেই মানুষের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার প্রতি নিজের শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আসিফ নজরুলের এই বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কথা উঠে এসেছে। একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার স্বীকৃতি, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর শাসনামলের সমালোচনা দুই দিকই তিনি একই বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।
বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে নিজের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল একটি জটিলতা তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন আসিফ নজরুল।
তিনি শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে বলেন, তাঁর শাসনে বঙ্গবন্ধুর নাম ও পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নিজের ভাষায়, শেখ হাসিনা তাঁর শাসনকে প্রতিষ্ঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।
আসিফ নজরুলের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি নিয়েও সমাজে নতুন ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার শাসনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামকে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করার ফলে পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই একটি রাজনৈতিক পক্ষের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এ কারণেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
নিজের বক্তব্যে আসিফ নজরুল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শেখ হাসিনার শাসনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘দ্বিতীয় মৃত্যু’ ঘটেছে শেখ হাসিনার আমলে।
তাঁর এই মন্তব্য মূলত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পরিচয় ও উত্তরাধিকারকে কীভাবে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গেই করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কোনো নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সেই ব্যক্তিত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বেদনাবিধুর দিন। এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে নিহত হন। তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যও ওই ঘটনায় প্রাণ হারান।
১৫ আগস্টের এই দিনটিকে স্মরণ করে আসিফ নজরুল তাঁর ফেসবুক পোস্টের শেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা ও দোয়া জানিয়েছেন।
তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

