বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন বন কর্মকর্তা একটি উদ্ধার করা সম্বর হরিণকে নিজের হাতে পোহা (চিঁড়ের পোলাওজাতীয় খাবার) খাইয়ে সামাজিক মাধ্যমে সেই ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। মানবিকতার প্রকাশ হিসেবে দেখা গেলেও এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বন দফতর ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে এমন আচরণ শুধু নিয়মবিরুদ্ধই নয়, প্রাণীটির স্বাভাবিক জীবনধারার জন্যও ক্ষতিকর।
মধ্যপ্রদেশের সাতপুরা টাইগার রিজার্ভের এক বন কর্মকর্তা সম্প্রতি একটি ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যায়, তিনি উদ্ধার করা একটি সম্বর হরিণকে নিজের হাতে পোহা খাওয়াচ্ছেন এবং স্নেহভরে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রথমে ঘটনাটিকে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরপরই বন দফতর পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বন দফতরের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মধ্যপ্রদেশ সিভিল সার্ভিসের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনকালে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে এমন ব্যক্তিগত ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ নিয়মের পরিপন্থী।
বরখাস্তের পাশাপাশি তাঁর ওপর প্রশাসনিক কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে প্রধান কার্যালয় ছাড়ার আগে তাঁকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের দেওয়া খাবার বন্য প্রাণীর জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রথমত, প্রাণীরা যদি নিয়মিত মানুষের কাছ থেকে খাবার পেতে শুরু করে, তাহলে তাদের মানুষের প্রতি স্বাভাবিক ভয় ধীরে ধীরে কমে যায়। ফলে তারা খাবারের সন্ধানে বন ছেড়ে গ্রাম, শহর কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে।
এর ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক সময় সড়কে উঠে আসার কারণে যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে।
প্রকৃতিতে প্রতিটি বন্যপ্রাণী নিজস্ব উপায়ে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। কিন্তু মানুষ যদি নিয়মিত খাবার সরবরাহ করে, তাহলে সেই স্বাভাবিক দক্ষতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে প্রাণীগুলো নিজেরাই খাদ্য সংগ্রহে অনাগ্রহী হয়ে ওঠে। এটি তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ব্যাহত করে এবং বনে স্বাধীনভাবে টিকে থাকার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
পোহা বা চিঁড়ের পোলাও মানুষের জন্য সুস্বাদু খাবার হলেও তা সম্বর হরিণের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্যপ্রাণীর পরিপাকতন্ত্র নির্দিষ্ট ধরনের প্রাকৃতিক খাদ্যের সঙ্গে মানিয়ে গড়ে উঠেছে। মানুষের তৈরি খাবারে থাকা বিভিন্ন উপাদান প্রাণীর শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এতে হজমের সমস্যা, অপুষ্টি কিংবা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই ঘটনার মাধ্যমে মধ্যপ্রদেশের বন দফতর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের নিয়মভঙ্গ সহ্য করা হবে না।
দফতরের মতে, বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা দেখানোর সবচেয়ে সঠিক উপায় হলো তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেওয়া। আবেগের বশে মানুষের খাবার খাওয়ানো বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা শেষ পর্যন্ত প্রাণীটিরই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যপ্রাণীকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল আচরণ। তাদের স্পর্শ করা, খাবার দেওয়া বা মানুষের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা কখনোই সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ নয়।
সচেতনতা বাড়ানো এবং বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করলেই মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সুস্থ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
একজন বন কর্মকর্তার সদিচ্ছা থাকলেও নিয়ম অমান্য করার ফল কতটা গুরুতর হতে পারে, এই ঘটনাটি তারই উদাহরণ। বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই সহানুভূতি যেন তাদের স্বাভাবিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বন দফতরের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।
-সংবাদ সংস্থার সাহায্য নিয়ে লেখা
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

