পৃথিবীর সমুদ্র এখনও মানুষের কাছে এক বিশাল রহস্য। স্থলভাগের অনেকটাই আমরা ঘুরে দেখলেও সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রাণের জগত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও খুব সীমিত। সেই অজানা জগতেরই নতুন কিছু দরজা খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা।
এক বছর ধরে চালানো ধারাবাহিক সামুদ্রিক অভিযানে বিজ্ঞানীরা ১,১২১টি এমন সামুদ্রিক প্রজাতি শনাক্ত করেছেন, যেগুলো আগে বিজ্ঞানের কাছে অজানা ছিল। এর মধ্যে কিছু প্রাণীর চেহারা এতটাই অদ্ভুত যে প্রথম দেখায় সেগুলোকে পৃথিবীর প্রাণী না ভেবে কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতে পারে।
কেউ বাস করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েকশো মিটার নিচে, আবার কেউ থাকে প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার গভীরে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপেক্ষাকৃত অগভীর পানিতেও মিলেছে নতুন প্রাণী।
সব মিলিয়ে এই আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি এখনও আমাদের চোখের নিচেই লুকিয়ে আছে।
ভাবুন, আপনি সমুদ্রের গভীরে নামছেন। চারপাশে অন্ধকার। সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। আর হঠাৎ সামনে দেখা গেল এমন একটি প্রাণী, যার শরীরের গঠন এতটাই অস্বাভাবিক যে সেটিকে পৃথিবীর প্রাণী বলেই মনে হতে চাইবে না।
বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক অভিযানে এমন অনেক প্রাণীর সন্ধান মিলেছে।
কোথাও পাওয়া গেছে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা রঙিন একটি কৃমি। তার শরীরের উজ্জ্বল রং দেখে মনে হতে পারে, এটি কোনো সায়েন্স-ফিকশন সিনেমার চরিত্র।
কিন্তু এগুলো কোনো কাল্পনিক প্রাণী নয়।
সবই পৃথিবীর সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের অংশ।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন প্রাণীর সংখ্যা হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
এই অসাধারণ আবিষ্কারগুলো হয়েছে Ocean Census নামের একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের গবেষণার মাধ্যমে। সমুদ্রের এমন প্রাণীদের খুঁজে বের করা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তৃতীয় বছরের কার্যক্রমে গবেষকরা ১৩টি সামুদ্রিক অভিযান এবং ৯টি বিশেষ প্রজাতি শনাক্তকরণ কর্মশালা পরিচালনা করেন।
এই সময়ের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১,১২১টি বিজ্ঞানের কাছে আগে অজানা প্রজাতি শনাক্ত করেন।
সংখ্যাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ মাত্র এক বছরের গবেষণায় এত বিপুল সংখ্যক নতুন প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে।
Ocean Census-এর তথ্য অনুযায়ী, আগের সময়ের তুলনায় এই সময়ে সামুদ্রিক নতুন প্রজাতি শনাক্তের বার্ষিক হার প্রায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা এখন শুধু মাঝেমধ্যে নতুন কোনো প্রাণীর সন্ধান পাচ্ছেন না। আধুনিক প্রযুক্তি ও ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে সমুদ্র থেকে বিপুল সংখ্যক নতুন জীবের সন্ধান মিলছে।
এই গবেষণার আরেকটি চমক হলো প্রাণীগুলোর বাসস্থানের বৈচিত্র্য।
কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে অপেক্ষাকৃত অগভীর উপকূলীয় এলাকা থেকে। আবার কিছু প্রাণীর সন্ধান মিলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৬,৫৭৫ মিটার নিচে।
এত গভীরে পরিবেশ একেবারেই অন্যরকম।
সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছায় না বললেই চলে। পানির চাপ অত্যন্ত বেশি। তাপমাত্রাও অনেক কম। খাবারের উৎসও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তারপরও সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।
গবেষণায় কোরাল, কাঁকড়া, চিংড়ি, সামুদ্রিক শজারু এবং সি অ্যানিমোনসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে।
এই বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে সমুদ্র যত গভীরে খোঁজা হচ্ছে, ততই নতুন জীববৈচিত্র্যের সন্ধান মিলছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগভীর সমুদ্রের পানিতে পাওয়া একটি ছোট কৃমি গবেষকদের নজর কেড়েছে।
প্রাণীটির দৈর্ঘ্য তিন সেন্টিমিটারেরও কম। কিন্তু এর শরীরের উজ্জ্বল রং তাকে সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
প্রকৃতিতে উজ্জ্বল রং অনেক সময় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রাণী বিষাক্ত হতে পারে, শিকারির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে অথবা তাকে খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ—উজ্জ্বল রং কখনও কখনও এমন সংকেত দেয়।
এই কৃমিটির ক্ষেত্রেও এমন কোনো প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রয়েছে কি না, তা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
তবে এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, নতুন প্রাণী খুঁজতে সবসময় সমুদ্রের অতল গভীরে যেতে হয় না।
উপকূলের কাছাকাছিও এখনও এমন প্রাণী লুকিয়ে থাকতে পারে, যাদের সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগে কিছুই জানতেন না।
গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের অদ্ভুত চেহারা বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করে আসছে।
কোনো প্রাণীর বিশাল মুখ, কারও স্বচ্ছ শরীর, কারও আবার আলো তৈরি করার ক্ষমতা। কেউ অদ্ভুতভাবে চলাফেরা করে, আবার কারও শরীরের গঠন এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রথম দেখায় তাকে পৃথিবীর প্রাণী বলে বিশ্বাস করাই কঠিন।
এই কারণেই নতুন আবিষ্কৃত অনেক সামুদ্রিক প্রাণীকে দেখে ভিনগ্রহের প্রাণীর কথা মনে হয়।
বিষয়টির মধ্যে একটি মজার বৈপরীত্যও রয়েছে।
মানুষ চাঁদে গেছে, মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠিয়েছে এবং দূরবর্তী গ্রহ-উপগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা খুঁজছে। অথচ নিজের গ্রহের সমুদ্রের বিশাল অংশ এখনও আমাদের কাছে অজানা।
দূরের গ্রহের ছবি তুলতে পারলেও পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণী এখনও মানুষের বৈজ্ঞানিক তালিকায় জায়গা পায়নি।
পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ অংশ সমুদ্র দিয়ে ঢাকা। কিন্তু সমুদ্রের বড় একটি অংশ বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা এখনও অত্যন্ত কঠিন।
গভীর সমুদ্রে গবেষণা করতে বিশেষ জাহাজ, রিমোটলি অপারেটেড যান, সাবমার্সিবল, উন্নত ক্যামেরা এবং প্রশিক্ষিত গবেষক প্রয়োজন হয়।
এমনকি কোনো অচেনা প্রাণী খুঁজে পাওয়ার পরও কাজ শেষ হয় না।
গবেষকদের তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে হয়। পরিচিত প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করতে হয়। প্রয়োজন হলে জেনেটিক তথ্যও বিশ্লেষণ করতে হয়।
এরপর নিশ্চিত হতে হয়, প্রাণীটি সত্যিই নতুন কোনো প্রজাতি কি না।
এই কারণেই ১,১২১টি নতুন প্রজাতির সন্ধান শুধু অদ্ভুত প্রাণী আবিষ্কারের ঘটনা নয়। এটি সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর একটি বড় বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ।
Ocean Census-এর উদ্দেশ্য শুধু অদ্ভুত দেখতে প্রাণী খুঁজে বের করা নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র অঞ্চলে থাকা অজানা প্রাণীদের শনাক্ত ও নথিভুক্ত করে সামুদ্রিক জীবনের একটি আরও পরিষ্কার চিত্র তৈরি করাই এই উদ্যোগের বড় লক্ষ্য।
এই কাজ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
যে প্রাণীর অস্তিত্বই আমরা জানি না, তাকে রক্ষা করাও কঠিন।
তাই প্রতিটি নতুন প্রজাতির আবিষ্কার সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানে নতুন একটি অংশ যোগ করে।
সাম্প্রতিক অভিযানের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকগুলোর একটি হলো গবেষণার গভীরতা।
অগভীর উপকূলীয় পানি থেকে শুরু করে প্রায় ৬,৫৭৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।
গভীর সমুদ্র পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম পরিবেশগুলোর একটি। কয়েক কিলোমিটার নিচে নামার পর সূর্যের আলো পুরোপুরি হারিয়ে যায়। পানির চাপ ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যায়। পরিবেশও হয়ে ওঠে মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল।
তারপরও সেখানে জীবনের অভাব নেই।
বরং এমন একটি জটিল প্রাণীজগৎ সেখানে রয়েছে, যাদের অনেকেই চরম পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এখনও পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। মঙ্গলগ্রহ নিয়ে গবেষণা চলছে। বৃহস্পতি ও শনির কিছু উপগ্রহেও প্রাণ টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে।
কিন্তু পৃথিবীর সমুদ্র আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
জীবন আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
১,১২১টি নতুন সামুদ্রিক প্রজাতির আবিষ্কার দেখিয়ে দিয়েছে, সমুদ্রের নিচে এখনও কত কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে।
কোনো প্রাণী ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আবার কোনোটি হয়তো শুধু পৃথিবীর জীবনের বিশাল বৈচিত্র্যের আরেকটি শাখা হিসেবে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত এই প্রাণীগুলো আমাদের আবিষ্কারের অপেক্ষায় ছিল না। তারা সম্ভবত কোটি কোটি বছর ধরেই পৃথিবীতে নিজেদের মতো করে বেঁচে আছে।
মানুষ এখনও পৃথিবীর সমুদ্রের খুব সামান্য অংশই বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করতে পেরেছে।
প্রতিটি নতুন অভিযান তাই নতুন প্রাণী, নতুন পরিবেশ এবং নতুন বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের দরজা খুলে দিতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগভীর পানিতে থাকা ছোট্ট রঙিন কৃমি থেকে শুরু করে সমুদ্রপৃষ্ঠের ছয় কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে বসবাসকারী প্রাণী সবাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য কতটা বিস্ময়কর।
আমরা যখন মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সন্ধান করছি, তখন আমাদের নিজের গ্রহের নিচেই রয়েছে বিশাল এক অজানা জগৎ।
ভিনগ্রহের মতো দেখতে প্রাণী খুঁজতে হয়তো মহাকাশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
কখনও কখনও শুধু সমুদ্রের আরও গভীরে তাকালেই হয়।


