যশোরের কেশবপুরে বসবাসকারী বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান এখন খাবারের অভাবে নিজেদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় তারা বাসাবাড়ি, ফলের বাগান ও কৃষিজমিতে হানা দিচ্ছে। একদিকে যেমন মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে এই প্রাণীগুলো, অন্যদিকে কৃষকদের ফসলের ক্ষতির কারণে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা, হাসপাতালপাড়া ও অফিসপাড়াকেন্দ্রিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের বসবাস। এই এলাকাকে কেন্দ্র করেই তাদের একটি স্থায়ী আবাস গড়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে হনুমানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্যের ব্যবস্থাও করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হনুমানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত খাদ্য আর তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে খাবারের সন্ধানে তারা কেশবপুর ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে হনুমানের দল নিয়মিতভাবে বেনাপোল পৌর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে প্রবেশ করছে। খাবারের খোঁজে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মানুষের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
শুরুর দিকে এলাকাবাসী এই বিরল প্রাণীগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে কলা, রুটি, ফলসহ বিভিন্ন খাবার দিতেন। শিশু-কিশোরদের কাছেও হনুমানের উপস্থিতি ছিল আনন্দের বিষয়। অনেকেই তাদের কাছ থেকে নির্ভয়ে ছবি তুলেছেন এবং খাবার খাইয়েছেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হনুমানের সংখ্যা ও আনাগোনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় তাদের দেখা মিলছে, যা অনেক বাসিন্দার জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাবারের অভাবে শুধু বাড়িঘরেই নয়, কৃষকের ফলের বাগানেও হানা দিচ্ছে কালোমুখো হনুমানের দল। বিশেষ করে বাতাবি লেবু, আমড়া, পেয়ারা, সফেদা, কলাসহ বিভিন্ন ফলের বাগানে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করছে।
অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু ফল খেয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না; গাছের ডাল ভেঙে ফেলছে এবং পুরো বাগানের ক্ষতি করছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে।
ফসল রক্ষার জন্য অনেক কৃষক এখন দিন-রাত ক্ষেত ও বাগান পাহারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কৃষিকাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাণী স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে চলে এলে তার অন্যতম প্রধান কারণ হয় খাদ্যের সংকট। কেশবপুরের কালোমুখো হনুমানের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে অভয়ারণ্যে যে পরিমাণ খাদ্য বরাদ্দ রয়েছে, তা ক্রমবর্ধমান হনুমানের সংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে তারা বাধ্য হয়ে মানুষের বসতিতে প্রবেশ করছে এবং সহজলভ্য খাবারের সন্ধান করছে।
এভাবে চলতে থাকলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে, যা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
এখনও অনেক মানুষ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হনুমানগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা সুযোগ পেলেই ফল বা অন্যান্য খাবার দিয়ে প্রাণীগুলোর ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করেন।
তবে অন্যদিকে অনেক পরিবার নিয়মিত হনুমানের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। বাড়ির উঠানে শুকাতে দেওয়া খাবার, রান্নাঘরের ফলমূল কিংবা গাছের ফল নষ্ট হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে।
তবুও অধিকাংশ বাসিন্দার মত, এই বিরল প্রজাতির প্রাণীকে রক্ষা করা জরুরি। তবে সেই সঙ্গে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত না হয়।
প্রাণী সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টদের মতে, কালোমুখো হনুমান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী সম্পদ। তাদের টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু খাদ্য সরবরাহ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন—
- হনুমানের জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত খাদ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি।
- প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ।
- হনুমানের সংখ্যা ও চলাচল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
- স্থানীয় জনগণকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতন করা।
- কৃষকদের ক্ষতি কমাতে কার্যকর সহায়তা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে যেমন বিরল এই প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাতও অনেকাংশে কমে আসবে।
যশোরের কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান আজ খাদ্যের সংকটে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে তারা লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যার ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি মিললেও অন্যদিকে কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ, আবাসস্থল উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিরল এই প্রাণীকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

