প্রযুক্তির দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। একের পর এক বড় প্রযুক্তি সংস্থা নিজেদের কাজের ধরন বদলাচ্ছে। সেই তালিকায় এবার নতুন করে শিরোনামে উঠে এল জনপ্রিয় প্রযুক্তি সংস্থা ক্লাউডফ্লেয়ার। সংস্থাটি ১১০০-রও বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হল, ব্যবসায় ক্ষতির কারণে নয়, বরং এআইয়ের উপর বেশি জোর দিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, ক্লাউডফ্লেয়ারের মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ কর্মী এই ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়েছেন। সংস্থার দাবি, ভবিষ্যতের কাজের ধরনকে মাথায় রেখে তারা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলছে। আর সেই ভবিষ্যতের কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এআই যুগে নতুন কৌশল ক্লাউডফ্লেয়ারের
ক্লাউডফ্লেয়ারের সিইও ম্যাথিউ প্রিন্স এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিশেল জ্যাটলিন কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, সংস্থাটি এখন “কৃত্রিম মেধার যুগ”-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কার্যক্রম সাজাচ্ছে। গত কয়েক মাসে সংস্থার অভ্যন্তরে এআই সরঞ্জামের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।
তাঁদের মতে, এআই শুধু প্রযুক্তির একটি নতুন অংশ নয়, বরং আগামী দিনের ব্যবসা পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছে। সেই কারণেই সংস্থার বিভিন্ন বিভাগ, পরিচালন ব্যবস্থা এবং কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এক সময় যে কাজের জন্য একাধিক কর্মীর প্রয়োজন হত, এখন সেই কাজের অনেকটাই এআই এবং অটোমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সংস্থাগুলি খরচ কমানোর পাশাপাশি কাজের গতি বাড়াতেও এআইকে কাজে লাগাচ্ছে।
ব্যবসায় মন্দা নয়, তবু ছাঁটাই কেন?
সাধারণত বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের পিছনে আর্থিক চাপ বা ব্যবসায় ক্ষতির কারণ থাকে। কিন্তু ক্লাউডফ্লেয়ারের ক্ষেত্রে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা।
সংস্থার সিইও ম্যাথিউ প্রিন্স স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ছাঁটাই কোনও আর্থিক সমস্যার জন্য হয়নি। বরং সংস্থার আয় এবং গ্রাহক সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। ব্যবসাও ভাল চলছে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে এখন থেকেই এআইভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছে সংস্থা।
তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক কাজ এখন এআই আগের চেয়ে অনেক দক্ষভাবে সামলাতে পারছে। যেমন—
• অর্থ সংক্রান্ত হিসাব
• অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা
• পরিচালন তদারকি
• মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপনা
• তথ্য বিশ্লেষণ
এই ধরনের কাজগুলোতে আগে বহু কর্মী প্রয়োজন হত। এখন সেগুলোর বড় অংশ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে করা সম্ভব হচ্ছে।
মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা
এই ছাঁটাইয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপর। ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, তারা মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপনার অনেক পদ কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি আলাদা আলাদা পরিচালন দলগুলিকেও একত্রিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বহু প্রযুক্তি সংস্থা বুঝতে পারছে যে, একই ধরনের একাধিক স্তরের ব্যবস্থাপনা অনেক সময় কাজের গতি কমিয়ে দেয়। সেখানে এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে।
ফলে ভবিষ্যতে আরও অনেক সংস্থা এই পথ অনুসরণ করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এআই কি সত্যিই চাকরি কেড়ে নেবে?
এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বের কর্মজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। ক্লাউডফ্লেয়ারের এই সিদ্ধান্ত সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে ম্যাথিউ প্রিন্সের বক্তব্য কিছুটা আলাদা। তাঁর মতে, এআই সব চাকরি কেড়ে নেবে না। বরং কাজের ধরন বদলে দেবে। কিছু কাজ হারিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু নতুন ধরনের কাজও তৈরি হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন সংস্থাগুলি এমন কর্মী চাইছে যারা এআই ব্যবহার করতে জানে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে শুধু ডিগ্রি থাকলেই হবে না, প্রযুক্তিগত দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষানবিশ পদে বিপুল আবেদন
ছাঁটাইয়ের মধ্যেও ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, তাদের সংস্থায় এখনও প্রচুর শূন্য পদ রয়েছে। বিশেষ করে এআই এবং প্রযুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য নতুন কর্মী নিয়োগ চলছে।
এই গ্রীষ্মে সংস্থাটি ১,১১১টি শিক্ষানবিশ পদের জন্য প্রায় ১০ লক্ষ আবেদন পেয়েছে। যা থেকে বোঝা যায়, তরুণ প্রজন্ম এখন এআই-কেন্দ্রিক চাকরির দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
সংস্থার দাবি, নির্বাচিত অনেক প্রার্থীই এআই বিষয়ে দক্ষ এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ব্যবস্থায় কাজ করার জন্য প্রস্তুত।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এআই নির্ভরতা
শুধু ক্লাউডফ্লেয়ার নয়, বিশ্বের বহু বড় প্রযুক্তি সংস্থা এখন এআইকে কেন্দ্র করে নিজেদের ব্যবসা সাজাচ্ছে। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন থেকে শুরু করে অসংখ্য স্টার্টআপও এখন অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অফিসের বহু নিয়মিত কাজ এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এতে কিছু চাকরি কমলেও, নতুন প্রযুক্তি নির্ভর পেশার চাহিদা দ্রুত বাড়বে।
তাই কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে গেলে এখন থেকেই নতুন দক্ষতা শেখা জরুরি। বিশেষ করে এআই, ডেটা অ্যানালিসিস, সাইবার সিকিউরিটি এবং অটোমেশন প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান ভবিষ্যতে বড় সুবিধা দিতে পারে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কোন দিকে?
ক্লাউডফ্লেয়ারের এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় পরিবর্তন শুরু হয়ে গিয়েছে। আগে যেখানে কর্মীসংখ্যা বাড়ানোকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হত, এখন সেখানে প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আগামী দিনে সংস্থাগুলি হয়তো কম কর্মী নিয়েও বেশি কাজ করতে পারবে। আর সেই জায়গাতেই এআই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
তবে এর মানে এই নয় যে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। বরং মানুষের কাজের ধরন বদলাবে। যাঁরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তাঁদের জন্য ভবিষ্যতেও সুযোগ থাকবে।
ক্লাউডফ্লেয়ারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি সংস্থার ছাঁটাইয়ের খবর নয়, বরং গোটা প্রযুক্তি শিল্প কোন পথে এগোচ্ছে, তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।

