জার্মানির আক্রমণভাগ নিয়ে অনেক দিন ধরেই একটা কথা শোনা যাচ্ছিল—দলটা সুন্দর খেলছে, সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে একজন খাঁটি গোলস্কোরার নেই। সেই জায়গাতেই যেন হঠাৎ করেই আলো দেখালেন ডেনিজ উন্ডাভ। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে নেমে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, জার্মানির সামনে এখন একজন নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার দাঁড়িয়ে গেছে।
এক সময় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেও খুব একটা নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি উন্ডাভ। ব্রাইটনের হয়ে ২০২২/২৩ মৌসুমে ৩০ ম্যাচে ৮ গোল করেছিলেন—খারাপ না, কিন্তু যথেষ্টও না। তাই এক মৌসুম পরই তিনি ফিরে যান জার্মানিতে।
স্টুটগার্টে ফেরার পরই যেন তার ক্যারিয়ার নতুন করে শুরু হয়। সেখানে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স তাকে আবার জাতীয় দলে জায়গা করে দেয়। আর এখন, বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি নিজেকে প্রমাণ করার সেরা সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছেন।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে উন্ডাভ শুরুতে একাদশে ছিলেন না। কিন্তু যখন তাকে মাঠে নামানো হলো, তখন ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
মাঠে নামার মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় তিনি গোল করেন। দৌড়ের মধ্যে বাম পায়ে নিয়ন্ত্রিত ভলি—একদম ক্লাসিক স্ট্রাইকারের মতো ফিনিশ। গোলটা শুধু স্কোরলাইন সমান করেনি, জার্মানিকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসও এনে দেয়।
তারপর যোগ করা সময়ে আসে দ্বিতীয় গোল। ফেলিক্স নেমেচার কাছ থেকে আসা পাস দারুণভাবে কন্ট্রোল করে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান উন্ডাভ। এই গোলটাই শেষ পর্যন্ত জার্মানিকে জয় এনে দেয়।
জুলিয়ান নাগেলসমানের অধীনে জার্মানির খেলার স্টাইল অনেকটাই পজিশনাল, টেকনিক্যাল। তারা বল দখলে রেখে ছোট ছোট পাসে সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, সেই সুযোগগুলো গোল হয়ে উঠছে না।
কারণটা সহজ—দলে একজন ‘ন্যাচারাল প্রেডেটর’ বা গোল শিকারি স্ট্রাইকারের অভাব ছিল। উন্ডাভের পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিল, এই সমস্যার সমাধান হয়তো মিলেই গেছে।
তার গোল করার ধরণটা খুব স্বাভাবিক—ঠিক জায়গায় থাকা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর নির্ভুল শট। ঠিক যেমনটা একজন ক্লাসিক নাম্বার ৯-এর কাছ থেকে আশা করা হয়।
এই ম্যাচটা জার্মানির জন্য সহজ ছিল না। আইভরি কোস্ট তাদের ডিফেন্স খুব শক্ত করে সাজিয়েছিল। চারজন ডিফেন্ডার গভীরে থেকে জার্মানির আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছিল।
মাঝমাঠেও ছিল শক্ত উপস্থিতি। ফলে জার্মানির জন্য জায়গা তৈরি করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। প্রথমার্ধে তারা অনেক সুন্দর পাসিং করলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না।
ম্যাচের শুরুতে জার্মানি ভালো ছন্দে ছিল। কয়েকটা ভালো সুযোগও তৈরি করেছিল। কিন্তু প্রথমার্ধের ওয়াটার ব্রেক যেন সেই গতি একদম থামিয়ে দেয়।
বিরতির পর ম্যাচ নতুন করে শুরু হয়, আর তখনই আইভরি কোস্ট গোল করে এগিয়ে যায়। এই গোলটা জার্মানির জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল।
আইভরি কোস্টের হয়ে সবচেয়ে নজর কেড়েছেন ইয়ান দিয়োমান্দে। তাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে লিভারপুলের।
ম্যাচের শুরুতে তিনি কিছুটা ভুল করলেও, তার গতি আর দিক পরিবর্তনের দক্ষতা সত্যিই অসাধারণ। প্রথমার্ধে তার দারুণ এক দৌড় থেকে গোলের সুযোগ তৈরি হয়, যেখান থেকে শেষ পর্যন্ত আইভরি কোস্ট গোল করে।
তার খেলার স্টাইল এমন—হঠাৎ গতি বাড়িয়ে ডিফেন্স ভেঙে ফেলা, তারপর নিখুঁত পাস দেওয়া। এই ধরনের খেলোয়াড় সব সময়ই বিপজ্জনক।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচটা একদম সমানে সমান হয়ে যায়। দুই দলই আক্রমণে ওঠে, সুযোগ তৈরি করে। জার্মানির কাই হাভার্টজও কয়েকটা ভালো সুযোগ পান, কিন্তু গোল করতে পারেননি।
এই সময়টা ছিল খুব টানটান—যে কোনো দল গোল করতে পারত। ঠিক তখনই নাগেলসমানের বদলি খেলোয়াড়দের প্রভাব দেখা যায়।
জার্মান কোচের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সঠিক সময়ে সঠিক বদলি আনা। উন্ডাভ তো ছিলেনই, তার সঙ্গে নাদিয়েম আমিরিও ভালো খেলেছেন।
আমিরির ক্রস থেকেই আসে উন্ডাভের প্রথম গোল। শেষ মুহূর্তে আমিরি নিজেও প্রায় গোল করে ফেলেছিলেন, কিন্তু আইভরি কোস্টের গোলকিপার দারুণ সেভ করেন।
এই ম্যাচে কিছু খারাপ খবরও আছে। জার্মানির ডিফেন্ডার নিকো শ্লটারবেক প্রথমার্ধে গোড়ালিতে চোট পান এবং আর খেলতে পারেননি।
অন্যদিকে আইভরি কোস্টের উইলফ্রিড সিঙ্গোও ইনজুরিতে পড়েন। দিয়োমান্দেও ম্যাচের শেষদিকে কিছুটা খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন। তাদের জন্য এটা দুশ্চিন্তার বিষয়।
এই জয়ের ফলে জার্মানি পরের রাউন্ডে উঠে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো ডেনিজ উন্ডাভের পারফরম্যান্স।
একজন স্ট্রাইকার যখন এমনভাবে সুযোগ কাজে লাগায়, তখন কোচও তাকে আরও বেশি সুযোগ দিতে বাধ্য হন। এখন মনে হচ্ছে, জার্মানির আক্রমণে যে শূন্যতা ছিল, সেটা হয়তো উন্ডাভ পূরণ করতে পারবেন।
ভাবো তো, একটা দল সুন্দর খেলছে কিন্তু গোল করতে পারছে না—এটা ঠিক যেমন রান্না ভালো হলেও লবণ না থাকলে স্বাদ আসে না। উন্ডাভ সেই লবণের মতোই, যিনি পুরো খেলাটার স্বাদ বদলে দিয়েছেন।
এখন দেখার বিষয়, তিনি এই ধারাটা ধরে রাখতে পারেন কি না। যদি পারেন, তাহলে জার্মানির বিশ্বকাপ যাত্রা অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।

