খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালফ্যাশন নয়, বাধ্যবাধকতা! কেন কাটা জুতো পরে খেলছেন বিশ্বকাপের তারকা ফুটবলাররা?

ফ্যাশন নয়, বাধ্যবাধকতা! কেন কাটা জুতো পরে খেলছেন বিশ্বকাপের তারকা ফুটবলাররা?

অস্থি বিশেষজ্ঞ ডা. মাইকেল রবসনের মতে, গোড়ালির হাড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে আশপাশের টিস্যু ও পেশির ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। এমন অবস্থায় সাধারণ বুট পরে দীর্ঘ সময় খেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ফুটবলারদের জার্সি, বুট কিংবা খেলার ধরন সবই ভক্তদের নজর কাড়ে। এবারের আসরেও অনেক দর্শকের চোখে পড়েছে একটি অদ্ভুত বিষয়। কয়েকজন তারকা ফুটবলার এমন বুট পরে মাঠে নেমেছেন, যার গোড়ালির অংশ কাটা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে জুতোগুলো হয়তো ছিঁড়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।

এটি কোনো ফ্যাশন নয়, আবার জুতোর ত্রুটিও নয়। বরং এটি একটি বিশেষ শারীরিক সমস্যার কারণে নেওয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, যা অনেক পেশাদার ফুটবলারের ক্যারিয়ার রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্তুগালের উইঙ্গার পেদ্রো নেটোর বুট প্রথমবার অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার জুতোর পিছনের অংশ, অর্থাৎ গোড়ালির কাছে স্পষ্টভাবে কাটা ছিল। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো দুর্ঘটনাবশত ছিঁড়ে গেছে। পরে জানা যায়, বুটটি ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে কেটে ব্যবহার করা হয়েছে।

শুধু পেদ্রো নেটো নন, অতীতেও ব্রাজিলের ফিলিপে কুটিনহো, রবার্তো ফির্মিনো, জার্মানির ম্যাটস হামেলস এবং ইতালির কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ড্যানিয়েলে ডি রসির মতো ফুটবলারদেরও একই ধরনের বুট পরে খেলতে দেখা গেছে।

এর পেছনে রয়েছে একটি পরিচিত চিকিৎসাজনিত সমস্যা— হাগলান্ডস ডিফরমিটি (Haglund’s Deformity)।

হাগলান্ডস ডিফরমিটি হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে গোড়ালির পিছনের হাড় স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি বেরিয়ে আসে। এই বাড়তি হাড়ের অংশের খুব কাছ দিয়েই থাকে শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আকিলিস টেনডন

ফুটবল খেলায় দৌড়ানো, দিক পরিবর্তন, লাফানো কিংবা বলে জোরে শট নেওয়ার সময় আকিলিস টেনডনের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ফলে গোড়ালির হাড় যদি অস্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে থাকে, তাহলে বুটের সঙ্গে ঘর্ষণ বাড়ে এবং তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়।

এই ব্যথা শুধু খেলায় নয়, অনেক সময় স্বাভাবিক হাঁটাচলাকেও কঠিন করে তুলতে পারে।

১৯২৭ সালে সুইডিশ অর্থোপেডিক চিকিৎসক প্যাট্রিক হাগলান্ড প্রথম এই সমস্যার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই রোগের নাম রাখা হয় হাগলান্ডস ডিফরমিটি

প্রায় এক শতাব্দী পরে আধুনিক ফুটবলেও এই সমস্যাটি বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রম এবং দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের চাপের কারণে অনেক পেশাদার ফুটবলার এই সমস্যায় আক্রান্ত হন।

এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর এবং সহজ সমাধানগুলোর একটি হলো বুটের গোড়ালির অংশ কেটে নেওয়া।

এর ফলে বুটের শক্ত অংশটি আর বেরিয়ে থাকা হাড়ের সঙ্গে সরাসরি ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে না। গোড়ালির ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে ব্যথা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং খেলোয়াড় মাঠে নিজের স্বাভাবিক পারফরম্যান্স বজায় রাখতে পারেন।

অর্থাৎ, এটি কোনো স্টাইল নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা।

অস্থি বিশেষজ্ঞ ডা. মাইকেল রবসনের মতে, গোড়ালির হাড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে আশপাশের টিস্যু ও পেশির ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। এমন অবস্থায় সাধারণ বুট পরে দীর্ঘ সময় খেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফিফার মেডিক্যাল সেন্টার অব এক্সেলেন্সের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক বার্থোলোমিউ হাডসনের ব্যাখ্যাও একই রকম। তাঁর মতে, যদি গোড়ালির ওপর অতিরিক্ত চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু ব্যথাই নয়, ফোলা, প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সমস্যাকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে হাঁটাচলাতেও অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

যেসব ফুটবলারের হাগলান্ডস ডিফরমিটি রয়েছে, তাদের জন্য গোড়ালির অংশ কেটে বুট ব্যবহার করা বেশ উপকারী হতে পারে।

এতে বুটের সঙ্গে ঘর্ষণ কমে যায়, ব্যথা হ্রাস পায় এবং খেলার সময় স্বস্তি বাড়ে। বর্তমানে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে এমন পরিবর্তিত বুট ব্যবহার করা অনেকটাই পরিচিত দৃশ্য।

তবে সব খেলোয়াড় একইভাবে বুট কাটেন না। অনেকের জন্য বিশেষভাবে কাস্টমাইজড বুটও তৈরি করা হয়, যাতে গোড়ালির অংশে অতিরিক্ত জায়গা থাকে।

হাগলান্ডস ডিফরমিটি পুরোপুরি দূর করা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এর উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, শকওয়েভ থেরাপি, ব্যথানাশক ইনজেকশন, বিশেষ ইনসোল ব্যবহার এবং উপযুক্ত বুট নির্বাচন রোগীর জন্য উপকারী হতে পারে।

অফ-সিজনে বিশ্রাম ও পুনর্বাসনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পেশাদার ফুটবলারদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই অনেকেই ব্যথা নিয়েই খেলতে বাধ্য হন।

বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ কেউ সহজে হাতছাড়া করতে চান না।

আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের গতি আগের তুলনায় অনেক বেশি। খেলোয়াড়দের প্রায় প্রতিদিনই কঠোর অনুশীলন ও উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হয়। ফলে গোড়ালি, হাঁটু এবং পায়ের অন্যান্য অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

এ কারণেই হাগলান্ডস ডিফরমিটির মতো সমস্যাও ধীরে ধীরে বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আধুনিক স্পোর্টস প্রযুক্তির সাহায্যে খেলোয়াড়রা সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখলেও এটি পুরোপুরি এড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না।

বিশ্বকাপে কিছু ফুটবলারের গোড়ালির কাছে কাটা বুট দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবসম্মত সমাধান। হাগলান্ডস ডিফরমিটির কারণে অনেক ফুটবলারের জন্য সাধারণ বুট পরে খেলা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই তারা গোড়ালির অংশ কেটে বা বিশেষভাবে তৈরি বুট ব্যবহার করেন, যাতে ব্যথা কমে এবং সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দিতে পারেন।

তাই মাঠে কোনো ফুটবলারের কাটা গোড়ালির বুট দেখলে সেটিকে আর ফ্যাশনের অংশ ভাবার সুযোগ নেই। এটি আসলে একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের নিজের শরীরকে সুরক্ষিত রেখে দেশের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার এক বাস্তব ও প্রয়োজনীয় উপায়।