বাংলাদেশে শিশুদের জন্য পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন গত ১৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। মূলত ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের সংকটের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি স্থগিত হয়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুইবার এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের মার্চের পর আর কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। ফলে দেশের কোটি কোটি শিশু প্রয়োজনীয় ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অপুষ্টি, হাম, ডায়রিয়া এবং দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত নানা সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ হওয়ার কারণ কী?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চ মাসে আরও দুটি ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন আয়োজন করার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্যাপসুল সংগ্রহ না হওয়ায় সেই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় ক্যাম্পেইন আয়োজন পিছিয়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের মতে, ক্যাপসুল দেশে পৌঁছানোর পর দ্রুত কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ক্যাম্পেইন শুরু করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।
প্রতি বছর কত শিশু এই কর্মসূচির আওতায় আসে?
বাংলাদেশে জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কার্যক্রমের আওতায় সাধারণত ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।
বয়সভেদে শিশুদের দুটি ধরনের ক্যাপসুল দেওয়া হয়—
নীল রঙের ক্যাপসুল
ছয় মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের জন্য নির্ধারিত।
লাল রঙের ক্যাপসুল
১২ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য নির্ধারিত।
প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ শিশু এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে থাকে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শিশু পুষ্টি কার্যক্রমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
কেন দেখা দিল ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের সংকট?
এর আগে সরকার দরপত্র বা টেন্ডারের মাধ্যমে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহ করত। তবে স্বাস্থ্য খাতের অপারেশনাল পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউনিসেফের কাছ থেকে একটি রাউন্ডের ক্যাপসুল ক্রয় করলে আরেক রাউন্ডের ক্যাপসুল বিনামূল্যে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যয় সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সরবরাহ প্রক্রিয়ার জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে সময়মতো ক্যাপসুল দেশে পৌঁছায়নি। এর ফলেই জাতীয় পর্যায়ের ক্যাম্পেইন স্থগিত হয়ে যায়।
শিশুদের জন্য ভিটামিন-এ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভিটামিন-এ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন-এ ঘাটতি শুধু একটি পুষ্টিগত সমস্যা নয়; এটি শিশুদের জীবনঝুঁকির কারণও হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই ঘাটতি শিশুদের সংক্রমণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তোলে।
বাংলাদেশে পরিচালিত জাতীয় পুষ্টি জরিপে দেখা গেছে, ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি দুইজন শিশুর মধ্যে একজন ভিটামিন-এ ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া নারীদের মধ্যেও এই ঘাটতি উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে।
ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের সফলতার ইতিহাস
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়।
পরে এই উদ্যোগ দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে অন্যতম সফল কর্মসূচিতে পরিণত হয়। ধারাবাহিক ক্যাম্পেইনের ফলে রাতকানা রোগ কার্যত নির্মূলের পর্যায়ে চলে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাতকানা প্রতিরোধই নয়, ভিটামিন-এ শিশুদের বিভিন্ন সংক্রমণ মোকাবিলার ক্ষমতাও বৃদ্ধি করেছে। অতীতে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার কমাতেও এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এমনকি করোনা মহামারির সময়ও বাংলাদেশ প্রায় ৯৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে দুই কোটিরও বেশি শিশুকে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে বর্তমান দীর্ঘ বিরতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের প্রধান উপকারিতা
শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশ নিশ্চিত করতে ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর। এর উল্লেখযোগ্য উপকারিতাগুলো হলো—
১. দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করে
ভিটামিন-এ চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
শিশুর শরীরকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।
৩. শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে
হাড়, টিস্যু ও শরীরের স্বাভাবিক বিকাশে ভিটামিন-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. হাম ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমায়
সংক্রমণজনিত রোগের তীব্রতা ও জটিলতা কমাতে সহায়তা করে।
৫. ত্বকের সুরক্ষা নিশ্চিত করে
ত্বক ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
৬. রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক
পরোক্ষভাবে আয়রনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের দীর্ঘ বিরতি শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অপুষ্টি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নিয়মিত ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃমি শিশুদের শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়, যা অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, বরং শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উদ্যোগ। ১৪ মাস ধরে এই কর্মসূচি বন্ধ থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে। দ্রুত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করে কর্মসূচি পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি।
কারণ কোটি কোটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, পুষ্টিগত উন্নয়ন, দৃষ্টিশক্তি এবং সার্বিক সুস্থতা অনেকাংশেই এই ভিটামিন-এ কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় তাই জাতীয় ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

