খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালকারখানার শ্রমিক থেকে জার্মানির নায়ক! ডেনিজ উন্দাভের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

কারখানার শ্রমিক থেকে জার্মানির নায়ক! ডেনিজ উন্দাভের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

জার্মান ফুটবলের দুই পরিচিত মুখ যুর্গেন ক্লপ এবং টমাস মুলার মনে করেছিলেন, চোট কাটিয়ে ফেরা মুসিয়ালার পরিবর্তে উন্দাভকে শুরুর একাদশে রাখা উচিত। অন্যদিকে কিংবদন্তি লোথার ম্যাথেউস মুসিয়ালার পক্ষেই অবস্থান নেন।

বিশ্ব ফুটবলে রূপকথার গল্পের অভাব নেই। তবে ডেনিজ উন্দাভের জীবনকাহিনি যেন সেই রূপকথাকেও হার মানায়। একসময় জীবিকা নির্বাহের জন্য কারখানায় কাজ করা এই ফুটবলার আজ জার্মান জাতীয় দলের অন্যতম ভরসা। ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু জার্মানিকে নকআউট পর্বে পৌঁছে দেয়নি, বরং তাঁকে পরিণত করেছে দলের নতুন নায়কে।

জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচে ডেনিজ উন্দাভকে শুরুর একাদশে রাখেননি। কিন্তু আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে পরিস্থিতি বদলে যায়। এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন উন্দাভ। এরপর নিজের অসাধারণ দক্ষতায় জোড়া গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।

এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের আসরে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় তিনে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর অবদানেই জার্মানি নিশ্চিত করে নকআউট পর্বের টিকিট। দীর্ঘ ১২ বছর পর চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্যায়ে জায়গা করে নেয়।

বিশ্বকাপ চলাকালে জার্মান ফুটবল অঙ্গনে একটি বড় আলোচনা ছিল—প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়া উচিত জামাল মুসিয়ালার নাকি ডেনিজ উন্দাভের?

জার্মান ফুটবলের দুই পরিচিত মুখ যুর্গেন ক্লপ এবং টমাস মুলার মনে করেছিলেন, চোট কাটিয়ে ফেরা মুসিয়ালার পরিবর্তে উন্দাভকে শুরুর একাদশে রাখা উচিত। অন্যদিকে কিংবদন্তি লোথার ম্যাথেউস মুসিয়ালার পক্ষেই অবস্থান নেন।

আরও পড়ুন :   ফ্রি-তেই দেখা যাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, কীভাবে দেখবেন জেনে নিন

তবে মাঠের পারফরম্যান্সে উন্দাভ প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনি কেন আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে তিনি কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন।

বর্তমানের সফল উন্দাভকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার কতটা কঠিন পথ পেরিয়ে এসেছে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে বুন্দেশলিগার ক্লাব ওয়ের্ডার ব্রেমেন তাঁকে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ছিল তাঁর উচ্চতা। অনেকের জন্য এমন প্রত্যাখ্যান স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারত। কিন্তু উন্দাভ হাল ছাড়েননি।

ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে পেশাদার ফুটবলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। পরে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হ্যাভেলসের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু সেখানে পাওয়া সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না।

পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য উন্দাভকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ক্লাব থেকে পাওয়া অর্থ ছিল খুবই সীমিত। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে একটি কারখানায় কাজ করতে হয়।

প্রতিদিন আট ঘণ্টা শ্রম দেওয়ার পরও তিনি ফুটবল অনুশীলন বন্ধ করেননি। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, এরপর সরাসরি মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতেন। দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলেও পরদিন আবার একই রুটিন শুরু হতো।

আরও পড়ুন :  র‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ ঘিরে নতুন তথ্য: ২৯টি কক্ষ, ৭টি ‘ডেথ সেল’

এই কঠিন সময়ই তাঁর মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে। অনেকেই যেখানে স্বপ্ন ত্যাগ করে অন্য পেশা বেছে নিতেন, সেখানে উন্দাভ নিজের লক্ষ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে আসেননি।

সংগ্রামের ফল অবশেষে আসে। ২৩ বছর বয়সে তিনি প্রথম পেশাদার চুক্তি পান। বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয়েজে যোগ দিয়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিতে শুরু করেন।

সেখানে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদে নজরে পড়েন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নের। ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ার নতুন গতি পায়।

পরে তিনি জার্মানির বুন্দেশলিগা ক্লাব ভিএফবি স্টুটগার্টে যোগ দেন। ২০২৫ মৌসুমে স্টুটগার্টের জার্সিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে জাতীয় দলের দরজা খুলে ফেলেন। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতাতেই জায়গা পান বিশ্বকাপ দলে।

বিশ্বকাপের নায়ক হওয়ার পরও নিজের অতীতের কথা ভুলে যাননি ডেনিজ উন্দাভ। তিনি স্বীকার করেছেন, ব্রেমেনের প্রত্যাখ্যান তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছিল।

তবে সেই ব্যর্থতাই তাঁকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। জীবনের কঠিন সময়গুলো স্মরণ করে তিনি জানিয়েছেন, ভোরে উঠে কারখানায় কাজ করা, তারপর মাঠে অনুশীলন এবং রাতে বাড়ি ফেরা—এটাই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন।

আরও পড়ুন :  মাইকেল বুবলের সুরে বিশ্বকাপের রঙিন উদ্বোধন, টরন্টোতে ফুটবল উৎসবে মাতল হাজারো দর্শক

সেই সময়ের ত্যাগ ও পরিশ্রমই আজকের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। তাই তিনি মনে করেন, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

গত কয়েক মাসে উন্দাভের গোল করার ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। শেষ আট ম্যাচে তিনি করেছেন নয় গোল। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাস, গোল করার ক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা জার্মানিকে নতুন আশা দেখাচ্ছে।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তাঁর পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, তিনি শুধু একজন প্রতিভাবান ফুটবলার নন; তিনি একজন লড়াকু যোদ্ধাও।

ডেনিজ উন্দাভের গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়, এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য মানসিক শক্তির গল্প। যে তরুণকে একসময় উচ্চতার কারণে বাতিল করা হয়েছিল, যে জীবনের প্রয়োজনে কারখানায় কাজ করতেন, সেই মানুষটিই আজ বিশ্বকাপে জার্মানির অন্যতম বড় নায়ক।

ফুটবলের ইতিহাসে এমন গল্প খুব বেশি দেখা যায় না। তাই ডেনিজ উন্দাভের উত্থান নিঃসন্দেহে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক রূপকথাগুলোর একটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ