পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে সারা দেশে চলছে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ইতোমধ্যে অনেকেই রাজধানী ছেড়ে গ্রামের পথে রওনা হয়েছেন। তবে এবারের ঈদের আনন্দে কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বৈরী আবহাওয়া। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বাইরে বের হওয়া কিংবা কোরবানির প্রস্তুতিতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। অনেক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণও হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অনেক এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা বেশি থাকবে। এছাড়া বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু স্থানেও ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হতে পারে। ফলে ঈদের নামাজ, কোরবানি কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াতের সময় ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২৭ মে) আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ সক্রিয় রয়েছে। মূলত এই আবহাওয়াজনিত অবস্থার কারণেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
সাধারণভাবে বলা যায়, যখন বঙ্গোপসাগরে এমন লঘুচাপ তৈরি হয়, তখন বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে মেঘ জমে দ্রুত বৃষ্টি শুরু হয়। অনেক সময় এর সঙ্গে বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়াও দেখা দেয়। এবারও ঠিক তেমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তাপমাত্রায় খুব বড় পরিবর্তন আসবে না বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। দেশের দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে রাতের দিকে সামান্য কমতে পারে তাপমাত্রা। অর্থাৎ দিনের বেলায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হলেও বৃষ্টির কারণে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে খুলনা ও মোংলা অঞ্চলে। খুলনায় ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মোংলায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য গরমের অস্বস্তি এখনও পুরোপুরি কাটছে না।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সীতাকুণ্ডে, যেখানে ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ফেনীতে ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকাতেও ছিল ভারি বৃষ্টির প্রভাব। ঢাকায় ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জে ৩৮ মিলিমিটার, ফরিদপুরে ৩৭ মিলিমিটার এবং চট্টগ্রামে ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এই টানা বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সড়কে পানি জমে যানজটের ভোগান্তিও বেড়েছে। তাই ঈদের যাত্রাপথে বাড়তি সময় হাতে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু ঈদের দিনই নয়, ঈদের পরও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বজায় থাকবে।
এ সময় কোথাও কোথাও বজ্রসহ বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়াও হতে পারে। ফলে যারা ঈদের ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের আগেই আবহাওয়ার সর্বশেষ আপডেট দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বৃষ্টি ও পিচ্ছিল পরিবেশের কারণে কোরবানির সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে খোলা জায়গায় কোরবানি দিলে পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ ও পরিষ্কার জায়গা নির্বাচন করা জরুরি।
এছাড়া বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ বা গাছের নিচে অবস্থান না করাই ভালো। অনেক সময় হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ার কারণে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে বর্ষাকালের শুরুতে প্রায়ই ঈদের সময় বৃষ্টি দেখা যায়। তবে অনেকের কাছে বৃষ্টিভেজা ঈদও আলাদা আনন্দ নিয়ে আসে। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ, পরিবারের সঙ্গে ঘরে বসে আড্ডা কিংবা গরমের মধ্যে হঠাৎ ঠান্ডা আবহাওয়া—সব মিলিয়ে এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি হয়।
তবে যাদের দূরপাল্লার ভ্রমণ রয়েছে বা বাইরে বিভিন্ন কাজ করতে হবে, তাদের জন্য এই আবহাওয়া কিছুটা ভোগান্তির কারণ হতে পারে। তাই আবহাওয়ার আপডেট নিয়মিত দেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে বের হওয়াই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদুল আজহায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও উৎসবের আনন্দে যেন কোনো ঘাটতি না পড়ে, সেটাই প্রত্যাশা সবার।

