খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভঅ্যামাজনের জলে ডোবা জঙ্গলে নতুন ব্যাঙের সন্ধান, মিলন ডাকেই মিলল আসল পরিচয়

অ্যামাজনের জলে ডোবা জঙ্গলে নতুন ব্যাঙের সন্ধান, মিলন ডাকেই মিলল আসল পরিচয়

ব্যাঙ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তার ডাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রজননের সময় পুরুষ ব্যাঙ সাধারণত স্ত্রী ব্যাঙকে আকৃষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ডাক দেয়। প্রতিটি প্রজাতির সেই ডাকের ধরন, শব্দের গতি, কম্পাঙ্ক, দৈর্ঘ্য কিংবা পুনরাবৃত্তির মধ্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।

অ্যামাজন অরণ্যকে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার বলা হয়। এই বিশাল জঙ্গলের বহু অংশ এখনও মানুষের কাছে পুরোপুরি পরিচিত নয়। বিশেষ করে এমন কিছু বনাঞ্চল রয়েছে, যেগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পানিতে ডুবে যায়। সেই ঋতুভেদে প্লাবিত অরণ্যেই এবার বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে এমন এক ব্যাঙ, যাকে প্রথম দেখায় পরিচিত কয়েকটি প্রজাতি থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।

চেহারায় তেমন পার্থক্য না থাকলেও এই ব্যাঙের পরিচয় লুকিয়ে ছিল তার মিলন ডাক, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং শরীরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম গঠনে। গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি আসলে একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি।

অ্যামাজন অববাহিকার বিশাল অংশে নদী, খাল ও জলাভূমির প্রভাব রয়েছে। বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়লে জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি অনেকটাই সরে যায়। এই ধরনের বনকে সাধারণভাবে ঋতুভেদে প্লাবিত বনাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই পরিবর্তনশীল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাণীদেরও নানা ধরনের অভিযোজন তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই পরিবেশে বসবাসকারী কাছাকাছি প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করা অনেক সময় অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

নতুন ব্যাঙটির ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। চোখের সামনে প্রাণীটিকে দেখেও প্রথমে তার আলাদা পরিচয় বোঝার উপায় ছিল না। তার শরীরের গঠন এবং বাহ্যিক চেহারা পরিচিত আত্মীয় প্রজাতির সঙ্গে এতটাই মিল যে শুধু ছবি দেখে তাকে পৃথক করা প্রায় অসম্ভব।

প্রাণী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের আকার, রং, গঠন এবং অন্যান্য দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের বাহ্যিক চেহারা প্রায় একই হলেও তাদের জিনগত পরিচয় আলাদা।

বিজ্ঞানীরা এ ধরনের প্রাণীকে গুপ্ত প্রজাতি বা ক্রিপ্টিক স্পিসিস হিসেবে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ, দুটি প্রাণী দেখতে প্রায় একই হলেও তারা আলাদা প্রজাতির সদস্য হতে পারে।

নতুন অ্যামাজনীয় ব্যাঙটি সেই ধরনের একটি উদাহরণ। তার আসল পরিচয় জানতে গবেষকেরা শুধু চোখের দেখা তথ্যের ওপর নির্ভর করেননি। তাঁরা ব্যাঙটির ডাক, ডিএনএ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং বাসস্থান সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন।

ব্যাঙ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তার ডাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রজননের সময় পুরুষ ব্যাঙ সাধারণত স্ত্রী ব্যাঙকে আকৃষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ডাক দেয়। প্রতিটি প্রজাতির সেই ডাকের ধরন, শব্দের গতি, কম্পাঙ্ক, দৈর্ঘ্য কিংবা পুনরাবৃত্তির মধ্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, নতুন ব্যাঙটির মিলন আহ্বানের ডাক কাছাকাছি দেখতে অন্যান্য ব্যাঙের ডাকের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বাইরে থেকে একই রকম মনে হলেও শব্দের বৈশিষ্ট্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

এই পার্থক্যই গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। তাঁরা বুঝতে পারেন, প্রাণীটি হয়তো পরিচিত কোনো প্রজাতির সাধারণ সদস্য নয়; এর পেছনে আলাদা একটি বিবর্তনীয় পরিচয় থাকতে পারে।

শুধু ডাকের পার্থক্য থাকলেই একটি প্রাণীকে নতুন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। তাই গবেষকেরা ব্যাঙটির জিনগত বৈশিষ্ট্যও পরীক্ষা করেন।

ডিএনএ বিশ্লেষণে পাওয়া তথ্য আগের সন্দেহকে আরও শক্তিশালী করে। দেখা যায়, নতুন ব্যাঙটির জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কাছাকাছি প্রজাতির মিল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

অর্থাৎ, শুধু চেহারায় মিল থাকলেও বিবর্তনের পথে এই ব্যাঙ আলাদা একটি শাখা তৈরি করেছে। জিনগত তথ্য তাই প্রজাতিটির স্বতন্ত্র পরিচয়ের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

গবেষকেরা ব্যাঙটির শরীরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন। শরীরের আকার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপাত এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম গঠন কাছাকাছি প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বাহ্যিক পার্থক্য খুব বেশি না হলেও এই সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণে আলাদা পরিচয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এখানেই আধুনিক জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। কোনো প্রাণীকে নতুন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এখন শুধু তার চেহারা দেখা যথেষ্ট নয়। শব্দ, জিন, শারীরিক গঠন এবং পরিবেশ সব তথ্য একসঙ্গে বিচার করতে হয়।

একই ধরনের দেখতে দুটি ব্যাঙ যদি সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশে বসবাস করে, সেটিও গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

নতুন প্রজাতির ব্যাঙটি পশ্চিম অ্যামাজনের ঋতুভেদে প্লাবিত বনাঞ্চলে পাওয়া গেছে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তার আবাসস্থল পানিতে ডুবে যায়। আবার পানির স্তর কমে গেলে বনাঞ্চলের চেহারাও বদলে যায়।

এই বিশেষ পরিবেশের সঙ্গে ব্যাঙটির জীবনযাপন কীভাবে যুক্ত, সেটিও গবেষণার অংশ হয়েছে। কোনো প্রাণী কোন ধরনের পরিবেশ বেছে নেয়, কোথায় প্রজনন করে এবং কীভাবে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয় এসব তথ্য তার পরিচয় বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

প্রকৃতিতে বিবর্তন সব সময় এমনভাবে ঘটে না যে একটি নতুন প্রজাতির শরীরে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন তৈরি হবে। অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে জিনগতভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও দুটি প্রাণীর চেহারা প্রায় একই থাকতে পারে।

এ কারণেই গুপ্ত প্রজাতি শনাক্ত করা কঠিন। গবেষকেরা যদি শুধু রং বা শরীরের আকারের ওপর নির্ভর করতেন, তাহলে এই ব্যাঙটিও হয়তো দীর্ঘদিন পরিচিত কোনো প্রজাতির অংশ হিসেবেই থেকে যেত।

কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন প্রাণীর শব্দ রেকর্ড করা, ডিএনএ বিশ্লেষণ করা এবং পরিবেশগত তথ্য তুলনা করা সম্ভব। ফলে আগে চোখ এড়িয়ে যাওয়া অনেক প্রাণীর আলাদা পরিচয় ধীরে ধীরে সামনে আসছে।

এই আবিষ্কার শুধু একটি নতুন ব্যাঙের পরিচয় প্রকাশ করেনি। এটি অ্যামাজনের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের সামনে আরও বড় প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অরণ্য অ্যামাজনের অনেক অঞ্চল এখনও দুর্গম। কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও জলাভূমি, আবার কোথাও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পুরো বন পানিতে ডুবে যায়। ফলে প্রতিটি অঞ্চলে নিয়মিত গবেষণা চালানো সহজ নয়।

এর অর্থ হলো, সেখানে আরও বহু অজানা প্রাণী বা ইতিমধ্যে পরিচিত বলে ধরে নেওয়া প্রাণীর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে নতুন প্রজাতি।

অ্যামাজনের এই নতুন ব্যাঙ আবারও দেখিয়ে দিল, প্রকৃতিকে বুঝতে শুধু চোখের ওপর নির্ভর করলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেতে পারে।

একটি ব্যাঙ দেখতে পরিচিত হতে পারে, কিন্তু তার ডাক ভিন্ন। তার ডিএনএ ভিন্ন হতে পারে। তার শরীরের সূক্ষ্ম গঠন আলাদা হতে পারে। এমনকি তার পছন্দের বাসস্থানও অন্যদের থেকে আলাদা হতে পারে।

সব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার পরই তার প্রকৃত পরিচয় সামনে আসে।

অ্যামাজনের এই আবিষ্কার তাই শুধু একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বলে মনে হওয়া পরিবেশগুলোর মধ্যেও এখনও কত অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। প্রকৃতির জগতে কখনও কখনও একটি ডাকই এমন সত্য প্রকাশ করতে পারে, যা চোখে দেখা যায় না।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ