বাংলাদেশে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো রুটে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এতে গুরুতর আহত হচ্ছেন যাত্রীরা, কেউ হারাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি, আবার কোনো কোনো ঘটনায় ঘটছে মৃত্যুও। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে স্কুলপড়ুয়া শিশু ও কিশোররা। তবে এর পাশাপাশি কিছু পরিবহন ব্যবসায়ীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রেলওয়ে পুলিশ শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে অভিভাবকদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও জামতৈল স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় দ্রুতযান এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গুরুতর আহত হন ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন। জানালার বাইরে থেকে ছোড়া একটি পাথর সরাসরি তার ডান চোখে আঘাত করে।
চিকিৎসকদের মতে, তার চোখের নিচের হাড় ভেঙে গেছে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বর্তমানে চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়ায় পরিবারটি আর্থিক সংকটেও পড়েছে। একটি মাত্র পাথর একজন তরুণের শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সাব্বিরের ঘটনাই প্রথম নয়। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন রুটে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে পারাবত এক্সপ্রেসে এক শিশু যাত্রী পেটে আঘাত পায়। একই ট্রেনে কয়েক সপ্তাহ আগে আহত হন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে লোকোমাস্টার মাথায় আঘাত পান। কক্সবাজার এক্সপ্রেসে দুই যাত্রী গুরুতর আহত হন, যার মধ্যে একজনের চারটি দাঁত ভেঙে যায়।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, পাথর নিক্ষেপ কোনো সাধারণ দুষ্টুমি নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিষয়ে বাংলাদেশে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। ফলে ঠিক কতজন আহত হয়েছেন, কতজন মারা গেছেন বা কতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার নির্ভুল হিসাব পাওয়া কঠিন।
রেলওয়ের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসাবে গত এক দশকে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। একই সময়ে অন্তত ১০ থেকে ১২ জন যাত্রীর মৃত্যু এবং কয়েকশ মানুষ আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ঘটনার স্থান, সময়, ক্ষয়ক্ষতি, মামলা ও অভিযুক্তদের তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করা জরুরি। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
রেলওয়ে পুলিশের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত থাকে রেললাইনের আশপাশে বসবাসকারী শিশু-কিশোররা। তারা অনেক সময় খেলাচ্ছলে কিংবা কৌতূহলবশত চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে।
কিন্তু একটি ছোট্ট পাথর যে কারও চোখ নষ্ট করতে পারে, মাথায় মারাত্মক আঘাত করতে পারে কিংবা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এই ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগেরই কোনো ধারণা থাকে না।
এ কারণে রেলওয়ে পুলিশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্কুল, কলেজ, দোকানপাট ও জনসমাগমস্থলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমবার কোনো শিশুকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আটক করা হলে তার অভিভাবককে থানায় ডেকে সতর্ক করা হবে এবং মুচলেকা নেওয়া হবে।
পরবর্তীতে একই ঘটনা আবার ঘটলে অভিভাবকের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে শাস্তির সুযোগ সীমিত হলেও ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের বিরুদ্ধে শিশু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং পরিবারকে দায়িত্বশীল করে তোলা এবং শিশুদের অপরাধপ্রবণ আচরণ প্রতিরোধ করা।
রেলওয়ে পুলিশের কাছে এমন অভিযোগও এসেছে যে, কিছু অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ী ট্রেনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে সড়কপথে যাত্রী বাড়ানোর উদ্দেশ্যে লোক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করাতে পারে।
যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবুও প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য পরিকল্পিতভাবে ট্রেনে হামলা চালিয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে নয়, বরং সংগঠিত অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।
দুর্ঘটনা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবকে দায়ী করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে রেলপথকে অজনপ্রিয় করতে চাইছে কি না, অথবা যাত্রীদের মধ্যে ভয় তৈরি করার উদ্দেশ্য রয়েছে কি না সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন, ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও রেলওয়ে পুলিশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে।
স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হচ্ছে। স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজের আগে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ, সামাজিক প্রচারণা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় সন্দেহজনক কার্যকলাপ নজরদারির ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০০ যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করলেও প্রতিটি ট্রেনে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব হচ্ছে না।
একটি ট্রেনে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত তিনজন সদস্য প্রয়োজন হলেও বর্তমান জনবল দিয়ে মাত্র অর্ধেক ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন করা যায়।
রেলওয়ে পুলিশের বর্তমান সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার হলেও প্রয়োজন অন্তত পাঁচ হাজার সদস্য। নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

