চোটের কারণে মাঠে নামতে পারেননি নেইমার। শুধু তাই নয়, মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযানের প্রথম ম্যাচে তিনি রিজার্ভ বেঞ্চেও ছিলেন না। কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকাই। কারণ মাঠের বাইরে থেকেও তিনি এমন প্রভাব ফেলেছেন, যা অনেকের মতে ব্রাজিলকে বড়সড় অস্বস্তি থেকে রক্ষা করেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে আক্রমণাত্মক ফুটবল, অসাধারণ পাসিং এবং সৃজনশীলতার ঝলক। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে সেই পরিচিত ব্রাজিলকে যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। দলটি ছিল ছন্দহীন, আক্রমণে ছিল ধারহীনতা, আর মাঝমাঠেও দেখা যাচ্ছিল সমন্বয়ের অভাব।
মরক্কোর দুর্দান্ত শুরুতে চাপে পড়ে ব্রাজিল
ম্যাচের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে মরক্কো। তাদের সংগঠিত আক্রমণ এবং দ্রুতগতির ফুটবল ব্রাজিলের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলে। এরই ধারাবাহিকতায় ম্যাচের ২১ মিনিটে গোল করে মরক্কোকে এগিয়ে দেন ইসমাইল সাইবারি।
গোল হজম করার পরও ব্রাজিল খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না। দলের তারকা ফুটবলাররা নিজেদের সেরাটা দিতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। বিশেষ করে আক্রমণভাগে ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে বেশ বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল। তিনি বল পাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিপজ্জনক জায়গায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না।
জলপান বিরতিতে নেইমারের বিশেষ নির্দেশনা
ম্যাচের প্রথমার্ধে জলপান বিরতির সময় একটি ঘটনা পরবর্তীতে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে নেইমার ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে ডেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ব্রুনো গিমারেসের সঙ্গেও কথা বলেন।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেকের ধারণা, নেইমার ভিনিসিয়াসকে আরও ভেতরে ঢুকে খেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং গিমারেসকে সেই অনুযায়ী বল সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
ম্যাচের শুরুতে ভিনিসিয়াস বেশিরভাগ সময় উইং ধরে খেলছিলেন। ফলে তিনি গোলের জন্য কার্যকর অবস্থানে পৌঁছাতে পারছিলেন না। নেইমারের পরামর্শের পর তার অবস্থান এবং চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়।
পরামর্শের পরই আসে কাঙ্ক্ষিত গোল
নেইমারের সঙ্গে আলোচনার কিছুক্ষণ পরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ৩২ মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের নিখুঁত পাস ধরে বাম দিক থেকে দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়েন ভিনিসিয়াস জুনিয়র।
মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসির বোনো পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই ডান পায়ের অসাধারণ কার্ল শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। সেই গোলেই সমতায় ফেরে ব্রাজিল।
গোলটি শুধু ম্যাচে সমতা ফেরায়নি, বরং ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দেয়। আর এই গোলের পেছনে নেইমারের কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বিশ্বজুড়ে।
কেন নেইমার এখনও ব্রাজিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার?
অনেকেই মনে করেন, নেইমারের গুরুত্ব শুধু গোল করা বা অ্যাসিস্ট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মাঠে দলের নেতৃত্ব দেন, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়ান এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি তারই বড় উদাহরণ। মাঠে উপস্থিত না থেকেও তিনি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সতীর্থদের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই পরামর্শই শেষ পর্যন্ত দলের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে বলে বিশ্বাস করছেন সমর্থকদের একটি বড় অংশ।
ফুটবলে অভিজ্ঞতা এবং খেলার বুদ্ধিমত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও আবার প্রমাণ করেছেন নেইমার।
ব্রাজিলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমর্থকদের হতাশা
যদিও ব্রাজিল হার এড়াতে সক্ষম হয়েছে, তবুও দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট নন সমর্থকরা। অনেকের মতে, ম্যাচজুড়ে ব্রাজিলের খেলায় ছিল না সেই চেনা সৌন্দর্য।
বিশেষ করে পাসিং ফুটবলে দেখা গেছে দুর্বলতা। রাফিনহা, ভিনিসিয়াস এবং অন্যান্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় গড়ে তুলতে পারেননি। একাধিক সময় টানা কয়েকটি পাস সম্পন্ন করতেও হিমশিম খেতে হয়েছে দলটিকে।
অন্যদিকে মরক্কো দেখিয়েছে কেন তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং আত্মবিশ্বাসী খেলা ব্রাজিলকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে।
পরের ম্যাচে কি ফিরবেন নেইমার?
ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য সুখবর হলো, নেইমারের চোট অনেকটাই সেরে উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে আগামী ম্যাচে তাকে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তবে তিনি প্রথম একাদশে থাকবেন নাকি বদলি হিসেবে নামবেন, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। কোচিং স্টাফ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে।
নেইমার ফিরলে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তার সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব দলের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি হয়তো ব্রাজিলের জন্য নিখুঁত ছিল না, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—নেইমার শুধুমাত্র একজন ফুটবলার নন, তিনি দলের মস্তিষ্কও বটে। মাঠে না থেকেও তিনি কৌশলগত নির্দেশনা দিয়ে ম্যাচে প্রভাব ফেলেছেন এবং সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেছেন।
ভিনিসিয়াস জুনিয়রের সমতাসূচক গোলের পেছনে নেইমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—ব্রাজিলের ফুটবল দর্শন, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতার অন্যতম প্রতীক এখনও নেইমার। আর সেই কারণেই তিনি মাঠে থাকুন বা বাইরে, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকবেন।

