খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

শাপলা চত্বর থেকে পরীমণি কাণ্ড! বেনজীর আহমেদের আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইতিহাসে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ক্ষমতা, প্রভাব, বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক দুর্নীতির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে...
Homeভ্রমণ ও পর্যটনআমপ্রেমীদের জন্য দারুণ ভ্রমণ! বাংলার বিখ্যাত আমবাগান ও লুকিয়ে থাকা রত্ন

আমপ্রেমীদের জন্য দারুণ ভ্রমণ! বাংলার বিখ্যাত আমবাগান ও লুকিয়ে থাকা রত্ন

মালদহের ফজলি থেকে মুর্শিদাবাদের কোহিতুর, নদিয়ার আম্রপালি থেকে হুগলির হিমসাগর— বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের আমের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়। তাই গ্রীষ্মের ছুটিতে যদি একটু অন্যরকম ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে চান, তাহলে আম-সফর হতে পারে অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা।

গ্রীষ্ম মানেই আমের মৌসুম। আর আমপ্রেমীদের কাছে এই সময়টা যেন এক উৎসব। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন শুধুমাত্র আমের স্বাদ নেওয়ার জন্যই একটি ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার কথা? বিশ্বের অনেক দেশে ফলভিত্তিক পর্যটন বা ‘ফ্রুট ট্যুরিজম’ বেশ জনপ্রিয় হলেও বাংলায় এই ধারণা এখনও খুব বেশি পরিচিত নয়। অথচ পশ্চিমবঙ্গের আমের ইতিহাস, বৈচিত্র্য এবং খ্যাতি বিশ্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত।

মালদহের ফজলি থেকে মুর্শিদাবাদের কোহিতুর, নদিয়ার আম্রপালি থেকে হুগলির হিমসাগর— বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের আমের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়। তাই গ্রীষ্মের ছুটিতে যদি একটু অন্যরকম ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে চান, তাহলে আম-সফর হতে পারে অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা।

বাংলার আমের ঐতিহ্য: নবাবি বাগান থেকে আধুনিক চাষ

বাংলার আমের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরনো। মোগল আমল এবং পরবর্তীকালে নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে অসংখ্য নতুন জাতের আমের জন্ম হয়। নবাবদের বাগান শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা ছিল না, বরং ছিল নতুন জাত উদ্ভাবনের পরীক্ষাগার।

আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। বিভিন্ন জেলার চাষিরা দেশি আমের পাশাপাশি জাপান, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা জাতের আম চাষ করছেন। ফলে আমপ্রেমীদের জন্য বাংলা এখন এক বিশাল ভাণ্ডার।

মালদহ: বাংলার আম রাজধানী

কেন মালদহ আমপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ?

বাংলার আমের কথা উঠলে সবার আগে আসে মালদহের নাম। এই জেলার ইংরেজবাজার, মানিকচক এবং রতুয়া অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে আমের চাষ হয়। ২০০-এরও বেশি প্রজাতির আমের জন্য মালদহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত।

এখানে পাওয়া যায়—

  • ফজলি
  • হিমসাগর
  • লক্ষ্মণভোগ
  • গোপালভোগ
  • আম্রপালি
  • মোহনভোগ
  • অমৃতভোগ
  • মধুচুসকি
  • রাখালভোগ

এছাড়াও বহু বিরল প্রজাতির আম রয়েছে, যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেননি।

আমবাগানে ঘোরার অভিজ্ঞতা

মানিকচক ও রতুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় চোখ যতদূর যায় শুধু আমবাগান। অনেক বাগান ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হলেও আগাম যোগাযোগ করলে অনেক ক্ষেত্রে বাগান ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। কখনও কখনও গাছ থেকে আম পেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতাও মিলতে পারে।

মালদহে ঘোরার দর্শনীয় স্থান

আমের পাশাপাশি মালদহ ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে এর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি।

দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • আদিনা মসজিদ
  • একলাখি মসজিদ
  • বড় দরগাহ
  • ছোটি দরগাহ
  • কুতুবশাহী মসজিদ
  • ডিয়ার পার্ক
  • প্রাচীন গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ

ফলে এক সফরেই আমের স্বাদ এবং ইতিহাসের স্পর্শ— দুটিই পাওয়া যায়।

মুর্শিদাবাদ: নবাবি আমের রাজ্য

বিরল আমের খোঁজে

মুর্শিদাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই নবাবি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানকার বহু বিখ্যাত আম আজও কিংবদন্তির মতো পরিচিত।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—

  • কোহিতুর
  • মির্জা পসন্দ
  • রানি পসন্দ
  • সফদার পসন্দ
  • কালাপাহাড়
  • নবাব পসন্দ
  • বেগম পসন্দ

এই আমগুলোর অনেকই এখন বিরল হয়ে গেছে এবং সীমিত কিছু বাগানেই পাওয়া যায়।

রানিনগরের আমবাগান

মুর্শিদাবাদের রানিনগর, ইলশামারি ও আশপাশের গ্রামাঞ্চলে এখনও বড় বড় আমবাগান দেখা যায়। স্থানীয় উদ্যানপালকরা রানি, শাদোল্লা, বোম্বাই, ল্যাংড়া, বিশ্বনাথ ও চন্দনখোসা জাতের আম চাষ করেন।

গ্রামীণ পরিবেশে ঘুরে বেড়ানো এবং সরাসরি চাষির কাছ থেকে আম কেনার সুযোগ এখানে ভ্রমণকে আরও বিশেষ করে তোলে।

মুর্শিদাবাদের দর্শনীয় স্থান

আম-সফরের সঙ্গে ঘুরে নিতে পারেন—

  • হাজারদুয়ারি প্রাসাদ
  • বড় ইমামবাড়া
  • মদিনা মসজিদ
  • ওয়াসেফ মঞ্জিল
  • জগৎশেঠের বাড়ি
  • কাঠগোলা বাগান
  • জাফরাগঞ্জ দেউড়ি

ইতিহাস ও আম— দুইয়ের মেলবন্ধন মুর্শিদাবাদকে করে তুলেছে অনন্য।

নদিয়া: নতুন ও বিদেশি জাতের আমের ঠিকানা

নদিয়ার শান্তিপুর, ফুলিয়া, কৃষ্ণনগর এবং হরিণঘাটা অঞ্চলে প্রচুর আমের চাষ হয়। এখানে ঐতিহ্যবাহী হিমসাগর ও ল্যাংড়ার পাশাপাশি নতুন নতুন প্রজাতির আমও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বিশেষ আকর্ষণের আম

নদিয়ার বিভিন্ন নার্সারিতে দেখা যায়—

  • কাটিমন
  • ব্যানানা আম
  • ফোর কেজি আম
  • বাড়িফোর
  • আম্রপালি

অনেক ক্ষেত্রেই এসব আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হলেও শখের বাগান ও নার্সারিতে সহজেই দেখা যায়।

নদিয়ার ভ্রমণ আকর্ষণ

আমের পাশাপাশি ঘুরে দেখতে পারেন—

  • বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য
  • কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি
  • শান্তিপুরের টেরাকোটা মন্দির
  • অদ্বৈতপীঠ
  • ঐতিহ্যবাহী তাঁতপাড়া

এখানে সংস্কৃতি, কারুশিল্প এবং প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।

চন্দননগর, ব্যান্ডেল ও হুগলির আমবাগান

কলকাতা থেকে খুব কম সময়ের দূরত্বে অবস্থিত চন্দননগর ও হুগলির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য আমবাগান।

দেবানন্দপুর, পোলবা, রাজহাট ও গান্ধীগ্রাম অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে আমের বাগান বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

এখানকার জনপ্রিয় আম

  • বৈশাখী আম
  • শোরি আম
  • হিমসাগর

অনেক বাগানে আগাম যোগাযোগ করলে সরাসরি বাগান থেকে আম কেনার সুযোগ পাওয়া যায়।

কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান

ভ্রমণের সময় দেখে নিতে পারেন—

  • চন্দননগর স্ট্র্যান্ড
  • সেক্রেড হার্ট চার্চ
  • দুপ্লে মিউজিয়াম
  • ব্যান্ডেল চার্চ
  • হুগলি ইমামবাড়া

ফরাসি ঐতিহ্য এবং নদীর ধারের সৌন্দর্য এই সফরকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।

বাংলার অন্যান্য আম চাষ অঞ্চল

পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে উল্লেখযোগ্য আমবাগান।

যেমন—

  • বসিরহাট
  • বারুইপুর
  • দিয়াড়া
  • সিঙ্গুর
  • নৈহাটি

এছাড়া বিভিন্ন নার্সারিতে এখন চাষ হচ্ছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মিয়াজাকি, কস্তুরি, ব্যানানা এবং অন্যান্য বিদেশি জাতের আম।

আম-সফরের পরিকল্পনা কীভাবে করবেন?

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আম-ভিত্তিক পর্যটনের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয় বাগান মালিক বা নার্সারির সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।

সফরের সময় মাথায় রাখুন—

  • জুন ও জুলাই মাস সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
  • স্থানীয় বাজারে গেলে বিরল জাতের আমের খোঁজ পাওয়া যায়।
  • গ্রামাঞ্চলের বাগানে আগে থেকে অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।
  • আমের সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিও উপভোগ করুন।

আম শুধু একটি ফল নয়, বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আবেগের অংশ। তাই এই গ্রীষ্মে যদি ভিন্ন স্বাদের কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাহলে আম-সফর হতে পারে দারুণ একটি অভিজ্ঞতা। মালদহের বিস্তীর্ণ আমবাগান, মুর্শিদাবাদের নবাবি আম, নদিয়ার নতুন জাতের চাষ কিংবা চন্দননগরের সবুজ বাগান— প্রতিটি জায়গাই আপনাকে দেবে নতুন স্বাদ ও নতুন গল্প।

একদিকে রসালো আমের স্বাদ, অন্যদিকে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সৌন্দর্য— সব মিলিয়ে বাংলার আম-সফর নিঃসন্দেহে হয়ে উঠতে পারে গ্রীষ্মের সেরা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।