ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি খেলোয়াড় এসেছেন এবং গেছেন। কিন্তু কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে একেকটি প্রতিষ্ঠান। সেই তালিকার শীর্ষেই রয়েছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ মঞ্চে আবারও নিজের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স শুধু একটি সংখ্যা; প্রতিভা এবং মানসিক শক্তিই একজন কিংবদন্তিকে আলাদা করে তোলে।
মেসির এই অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী তারকা এবং বার্সেলোনার সাবেক মিডফিল্ড জেনারেল জাভি হার্নান্দেজ। তাঁর মতে, গত দুই দশক ধরে মেসির ধারেকাছে কেউ নেই এবং এখনও বিশ্বের সেরা ফুটবলার তিনিই।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখেছেন লিওনেল মেসি। ম্যাচজুড়ে তাঁর গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং গোল করার দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনটি গোল করে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন কেন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়।
৩৯ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছেও যে মানের ফুটবল তিনি খেলছেন, তা অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের কাছেও অনুকরণীয়। শুধু গোল নয়, পুরো ম্যাচে তাঁর উপস্থিতি এবং খেলার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
বার্সেলোনায় দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার সুবাদে মেসিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন জাভি। তিনি জানেন, মাঠে এবং মাঠের বাইরে মেসির মানসিকতা কতটা শক্তিশালী।
মেসির বর্তমান পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাভি তাঁকে বাস্কেটবলের কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ফুটবলে মেসির অবস্থান ঠিক যেমনটা বাস্কেটবলে জর্ডনের।
জাভি বলেন, মেসির মতো ধারাবাহিকতা ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড় দেখাতে পেরেছেন। গত ২০ বছর ধরে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছেন এবং এখনও প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে রয়েছেন।
জাভির মতে, মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে তাঁর জয়ের ক্ষুধা এবং কখনও হার না মানার মানসিকতা। একজন খেলোয়াড় যখন সবকিছু জিতে ফেলে, তখন সাধারণত তার মধ্যে আত্মতুষ্টি চলে আসে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।
বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর—সবকিছু জয়ের পরও তিনি এখনও নতুন শিরোপার জন্য একই রকম ক্ষুধার্ত। মাঠে নামলে মনে হয়, তিনি যেন প্রথম ট্রফি জয়ের জন্য লড়ছেন।
জাভি মনে করেন, এই অদম্য মানসিকতাই মেসিকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও শুধু গোল নয়, প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর লড়াই করার মনোভাব ফুটে উঠেছে।
মেসির খেলা দেখে এখনও বিস্মিত হন জাভি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর তিনি ব্যক্তিগতভাবে মেসিকে বার্তাও পাঠিয়েছিলেন।
জাভির ভাষায়, ম্যাচে মেসি প্রতিপক্ষকে নিয়ে যেন খেলছিলেন। মাঠে তাঁর চলাফেরা, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
সাবেক স্প্যানিশ তারকার মতে, মেসির সঙ্গে অন্য কোনো ফুটবলারের তুলনা করা কঠিন। কারণ তিনি এমন কিছু করেন, যা সাধারণ ফুটবলারদের পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব নয়। তাই জাভির বিশ্বাস, মেসি যেন এই পৃথিবীরই মানুষ নন; তিনি অন্য এক উচ্চতার ফুটবলার।
শুধু জাভি নন, আধুনিক ফুটবলের আরেক সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপেও মেসিকে বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচের আগে সাংবাদিকরা এমবাপেকে প্রশ্ন করেন—লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড এবং হ্যারি কেনের মধ্যে কে সেরা?
জবাবে ফরাসি তারকা স্পষ্টভাবেই মেসির নাম উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিশ্বের সেরা ফুটবলার মেসি। এরপর রয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। নিজের অবস্থানও তিনি পরের সারিতে রেখেছেন।
এমবাপের এই মন্তব্য ফুটবলবিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় নিজেই মেসির শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন।
মেসি ও এমবাপের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালের কথা। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত সেই ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা এবং ফ্রান্স।
ম্যাচজুড়ে ছিল নাটকীয়তা, উত্তেজনা এবং অসাধারণ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স। এমবাপে করেছিলেন হ্যাটট্রিক, অন্যদিকে মেসি করেছিলেন জোড়া গোল। নির্ধারিত সময় এবং অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জয় তুলে নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। সেই টুর্নামেন্টে মেসি জিতেছিলেন গোল্ডেন বল, আর এমবাপে পেয়েছিলেন গোল্ডেন বুট।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাইনাল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি।
মেসির শ্রেষ্ঠত্বের কারণ শুধু তাঁর গোলসংখ্যা নয়। তিনি একজন সম্পূর্ণ ফুটবলার। গোল করা, গোল বানানো, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই তিনি অনন্য।
তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলো ধারাবাহিকতা। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের সেরা লিগ ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে একই মান ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথচ মেসি সেটিই করে দেখিয়েছেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর হ্যাটট্রিক আবারও প্রমাণ করেছে যে ফুটবলের রাজত্ব এখনও তাঁর হাতেই রয়েছে। বয়স বাড়লেও তাঁর প্রতিভা, ফিটনেস এবং জয়ের ক্ষুধা একটুও কমেনি।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে লিওনেল মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক অনুভূতির নাম। তাঁর প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস এবং প্রতিটি গোল যেন ফুটবলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। জাভির মতো একজন বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি যখন বলেন “মেসি এই গ্রহের নয়”, তখন তা নিছক প্রশংসা নয়; বরং একজন অসাধারণ ফুটবলারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের জাদু দেখিয়ে মেসি প্রমাণ করেছেন, ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর যতদিন তিনি মাঠে থাকবেন, ততদিন তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং বিস্ময়ই চলতে থাকবে।

