২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই দেখা গেল তীব্র নাটকীয়তা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোলশূন্য প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে বিতর্কিত একটি পেনাল্টি সিদ্ধান্তকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কানাডার প্রধান কোচ জেসি মার্শ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন যে, ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমে রেফারির সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যান। তবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দেন তারই দলের ডিফেন্ডার মইজ বম্বিতো।
ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে কানাডার ডিফেন্ডার রিচি লারিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার খুলিসো মুদাউয়ের সঙ্গে বক্সের ভেতরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। কানাডার খেলোয়াড়রা সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির দাবি জানালেও মাঠের রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
পরে ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে জোরালো সংস্পর্শ হয়েছিল। তবে মুদাউ বলে সামান্য স্পর্শ করেছিলেন। সেই কারণেই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) মনে করে, মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো স্পষ্ট কোনো ভুল হয়নি। ফলে পেনাল্টির আবেদন নাকচই থেকে যায়।
প্রথমার্ধের বাঁশি বাজার পর অন্য কোচদের মতো ড্রেসিংরুমে না গিয়ে সরাসরি মাঠে প্রবেশ করেন জেসি মার্শ। তার লক্ষ্য ছিল ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বুঝতে পেরে সতীর্থদের আগে এগিয়ে আসেন কানাডার ডিফেন্ডার মইজ বম্বিতো।
তিনি প্রথমে কথার মাধ্যমে কোচকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে শারীরিকভাবে আটকে দিয়ে তাকে আরও সামনে এগিয়ে যেতে বাধা দেন। বম্বিতোর এই পদক্ষেপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসিত হয়েছে, কারণ এতে বড় ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।
বিবিসি রেডিওতে ম্যাচ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ডিওন ডাবলিন বলেন, রেফারি সঠিকভাবেই পরিস্থিতি সামলেছেন।
তার মতে, একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের কোচকে এমন পরিস্থিতিতে দূরে সরিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তিনি বলেন, মইজ বম্বিতো ঠিক সেটিই করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, জেসি মার্শ এতটা ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ তিনি পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
রেফারিং বিশ্লেষক ক্রিস্টিনা আনকেল প্রথমে মনে করেছিলেন, ঘটনাটি পেনাল্টি হওয়া উচিত ছিল। তার মতে, মাঠের রেফারিকে অন্তত ভিডিও মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখার পরামর্শ দেওয়া যেত।
তবে বিরতির সময় আরও বিস্তারিত রিপ্লে দেখার পর তিনি নিজের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ডিফেন্ডারের বলে সামান্য স্পর্শ থাকায় VAR-এর দৃষ্টিতে এটি “স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভুল” হিসেবে বিবেচিত হয়নি। তাই রেফারিকে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুপারিশ না করাই নিয়ম অনুযায়ী সঠিক হয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, এমন ঘটনাগুলোই ফুটবলে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন খেলোয়াড় কতটা জায়গা দখল করলে সেটি বৈধ চ্যালেঞ্জ থাকবে এবং কখন সেটি ফাউলে পরিণত হবে।
আইটিভির স্টুডিওতে উপস্থিত সাবেক ফুটবলার ব্র্যাডলি রাইট-ফিলিপস এবং কারেন কার্নিও মনে করেন, এটি পেনাল্টি ছিল না।
তাদের বিশ্লেষণে উঠে আসে, দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার প্রথমে বল স্পর্শ করেছিলেন। পাশাপাশি আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ও দুইজনের পায়ের জটলা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ফলে শুধুমাত্র সংঘর্ষের ভিত্তিতে পেনাল্টি দেওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল না।
বিশ্ব ফুটবলে VAR প্রযুক্তি চালুর পর থেকে বিতর্ক কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এই ম্যাচও তার ব্যতিক্রম নয়। একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক ফুটবলার, রেফারি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা।
কেউ মনে করছেন কানাডা বঞ্চিত হয়েছে, আবার কেউ বলছেন প্রযুক্তির সহায়তায় সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। ফলে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি এই পেনাল্টি বিতর্কও দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কানাডার ম্যাচটি প্রথমার্ধেই নাটকীয় মোড় নেয়। বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্ত, জেসি মার্শের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া এবং নিজের খেলোয়াড়ের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, VAR থাকলেও ফুটবলে বিতর্কের শেষ নেই।


