আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : NASA-র Roman Space Telescope-এর মহাকাশযাত্রা, ভিনগ্রহ ও মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজবে নাসার নতুন চোখ। মহাবিশ্বে কি পৃথিবীই একমাত্র প্রাণের আবাস? নাকি অসংখ্য নক্ষত্রের ভিড়ে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে আরও কোনো পৃথিবী, যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহু বছর ধরে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই অনুসন্ধানে যুক্ত হতে চলেছে NASA-র অত্যাধুনিক Nancy Grace Roman Space Telescope।
এই মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের লক্ষ্য শুধু সৌরজগতের বাইরের গ্রহ খুঁজে বের করা নয়। বিশাল পরিসরে মহাবিশ্বের ছবি তুলে Roman Telescope বিজ্ঞানীদের সামনে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি এবং মহাজাগতিক বিবর্তনের নতুন তথ্য তুলে ধরবে।
এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি একসঙ্গে আকাশের বিশাল অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট গ্রহ বা গ্যালাক্সিকে দীর্ঘ সময় ধরে দেখার পাশাপাশি মহাবিশ্বের অনেক বড় এলাকার একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করতে পারবে।
Nancy Grace Roman Space Telescope হলো NASA-র পরবর্তী প্রজন্মের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর নামকরণ করা হয়েছে NASA-র বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী Nancy Grace Roman-এর নামে।
মহাকাশ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে তাঁকে অনেক সময় ‘মাদার অব হাবল’ বলা হয়। NASA-র স্পেস টেলিস্কোপ কর্মসূচি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Roman সেই ঐতিহ্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে কাছের এবং দূরের মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ পাবেন।
পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো সাধারণ কৃত্রিম উপগ্রহের মতো Roman কাজ করবে না। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে Sun-Earth L2 অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান করবে।
L2 বা দ্বিতীয় Lagrange point হলো মহাকাশের এমন একটি বিশেষ অঞ্চল, যেখানে সূর্য ও পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে একটি মহাকাশযান তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অবস্থান বজায় রাখতে পারে।
এই অবস্থান থেকে Roman-এর জন্য গভীর মহাকাশ পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে। পৃথিবীর কাছাকাছি পরিবেশের কিছু বাধাও এভাবে এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে।
তবে গন্তব্যে পৌঁছালেই Roman-এর বৈজ্ঞানিক কাজ শুরু হয়ে যাবে না। প্রথমে NASA-র বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের কয়েক মাস ধরে এর বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করতে হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করার পরই শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ।
Roman Telescope-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ২.৪ মিটার প্রাইমারি মিরর। আয়নার আকারের দিক থেকে এটি Hubble Space Telescope-এর আয়নার কাছাকাছি।
কিন্তু Roman-এর আসল শক্তি শুধু আয়নার আকারে নয়। এর Wide Field Instrument একবারে আকাশের অনেক বড় অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
সহজভাবে বললে, Hubble যদি একটি বিশাল শহরের একটি নির্দিষ্ট এলাকার অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি তোলার ক্যামেরা হয়, তাহলে Roman একই সময়ে সেই শহরের অনেক বড় অংশের ছবি তুলতে পারবে।
এই ক্ষমতার কারণে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এরপর সেখান থেকে আকর্ষণীয় কোনো বস্তু শনাক্ত হলে অন্য শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে তার আরও বিস্তারিত গবেষণা করা যাবে।
Roman Telescope-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো exoplanet, অর্থাৎ সৌরজগতের বাইরের গ্রহ খুঁজে বের করা।
ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার exoplanet শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে কিছু গ্রহ পাথুরে, আবার কিছু বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ। কোন ধরনের গ্রহ কীভাবে তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Roman বিশেষভাবে gravitational microlensing পদ্ধতি ব্যবহার করবে।
এই পদ্ধতিতে মহাকর্ষের একটি বিশেষ প্রভাবকে কাজে লাগানো হয়। ধরুন, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নক্ষত্র আরেকটি দূরের নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। সামনের নক্ষত্রের মহাকর্ষ পেছনের নক্ষত্রের আলোকে সাময়িকভাবে বাঁকিয়ে ও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামনের নক্ষত্রটির চারপাশে কোনো গ্রহ থাকলে সেই গ্রহও আলোর মধ্যে খুব ছোট একটি অতিরিক্ত পরিবর্তন তৈরি করতে পারে। Roman-এর সংবেদনশীল যন্ত্র সেই ক্ষুদ্র সংকেত শনাক্ত করার চেষ্টা করবে।
এর ফলে এমন অনেক দূরবর্তী গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যেগুলো অন্য পদ্ধতিতে শনাক্ত করা কঠিন।
Roman Telescope নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জায়গাগুলোর একটি হলো পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধান।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। পৃথিবীর মতো দেখতে কোনো গ্রহ পাওয়া গেলেই সেখানে প্রাণ আছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
একটি গ্রহের আকার, কক্ষপথ বা তাপমাত্রা পৃথিবীর সঙ্গে মিলতে পারে। কিন্তু প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে আরও অনেক ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন।
তারপরও Roman-এর তথ্য বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে—পৃথিবীর মতো গ্রহ মহাবিশ্বে কতটা সাধারণ?
হয়তো এমন কোনো গ্রহ পাওয়া যাবে যা পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটাই মিল রাখে। আবার এমন অসংখ্য অদ্ভুত গ্রহও আবিষ্কৃত হতে পারে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আগে কোনো ধারণাই ছিল না।
Roman-এর গবেষণা শুধু ভিনগ্রহের সন্ধানেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি রহস্য—ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি—নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবে এটি।
ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না। এটি আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না। কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্যালাক্সির গঠন ও মহাবিশ্বের বড় কাঠামো তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি আরও রহস্যময়। মহাবিশ্ব ক্রমেই দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে। সেই ত্বরিত সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত অজানা প্রভাবকে বিজ্ঞানীরা ডার্ক এনার্জি নামে অভিহিত করেন।
Roman বিপুলসংখ্যক গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে তাদের অবস্থান, বিস্তার ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে। এসব তথ্য ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
James Webb অত্যন্ত দূরের মহাজাগতিক বস্তু অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। Hubble-ও দীর্ঘদিন ধরে মহাবিশ্বের অসাধারণ সব ছবি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়েছে।
অর্থাৎ Roman হয়তো প্রথমে বিশাল এলাকায় এমন কোনো গ্রহ, গ্যালাক্সি বা মহাজাগতিক ঘটনা খুঁজে বের করবে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। এরপর Webb বা অন্য কোনো টেলিস্কোপ সেই বস্তুটিকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
এক কথায়, Roman অনেকটা মহাবিশ্বের বিশাল একটি মানচিত্র তৈরি করবে, আর অন্য টেলিস্কোপ সেই মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে আরও গভীরভাবে নজর দেবে।
Nancy Grace Roman Space Telescope-এর যাত্রা মানবজাতির মহাকাশ অনুসন্ধানে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
এটি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ভিনগ্রহের প্রাণের প্রমাণ খুঁজে দেবে না। কিন্তু নতুন গ্রহ আবিষ্কার, গ্যালাক্সির বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ—সব মিলিয়ে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, Roman আমাদের নিজেদের পৃথিবী সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে।
যদি মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো অসংখ্য গ্রহ থাকে, তাহলে আমরা কি সত্যিই বিশেষ? আর যদি পৃথিবীর মতো গ্রহ খুবই বিরল হয়, তাহলে আমাদের গ্রহের অবস্থান কতটা ব্যতিক্রমী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো একদিন Roman-এর তথ্য থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে।
মহাকাশের প্রায় সীমাহীন অন্ধকারে তাকিয়ে এই নতুন টেলিস্কোপ হয়তো এমন কোনো সংকেত দেখতে পাবে, যা বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণাকে বদলে দেবে। আর সেই কারণেই Nancy Grace Roman Space Telescope শুধু আরেকটি মহাকাশযন্ত্র নয়—এটি মহাবিশ্বকে নতুন চোখে দেখার এক বিশাল সুযোগ।


