আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : প্রায় ২০০০ বছর আগে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা কৃত্রিম গর্ভনিরোধকের ধারণা যখন মানুষের কাছে ছিল না, তখনই গর্ভধারণ রোধের জন্য নানা ধরনের ভেষজ ও উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করত প্রাচীন সমাজ। সেই সময়ের এমনই এক রহস্যময় উদ্ভিদ ছিল সিলফিয়াম বা সিলফায়ন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় এই গাছ শুধু খাবার বা মশলা হিসেবেই নয়, গর্ভনিরোধক হিসেবেও ব্যবহৃত হত বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, একসময় এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সেই উদ্ভিদ পরবর্তীকালে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। গবেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত চাহিদা এবং নির্বিচারে সংগ্রহের কারণে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যেই সিলফিয়াম বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সত্যিই কি হারিয়ে যাওয়া সেই ‘অলৌকিক গাছ’-এর সন্ধান পাওয়া গেছে? তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়ায় পাওয়া একটি বিরল উদ্ভিদকে ঘিরেই নতুন করে শুরু হয়েছে গবেষণা ও জল্পনা।
সিলফিয়াম কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
সিলফিয়াম ছিল এক ধরনের বিরল উদ্ভিদ, যা মূলত প্রাচীনকালে উত্তর আফ্রিকার সাইরেনাইকা অঞ্চলে, বর্তমান লিবিয়ার এলাকায় পাওয়া যেত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে এই গাছের নানা অংশ ব্যবহার করা হত। এর কাণ্ড, মূল ও শিকড় রান্না করে খাওয়া হত। মাছ বা মাংসের সঙ্গে সিলফিয়াম দিয়ে স্যুপও তৈরি করা হত। তবে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল গাছটির কাণ্ড থেকে পাওয়া সুগন্ধি রস বা রজন।
সেই রস শুকিয়ে মশলার মতো ব্যবহার করা হত। সময়ের সঙ্গে সিলফিয়ামের চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে এটি অত্যন্ত মূল্যবান পণ্যে পরিণত হয়। প্রাচীন কিছু লেখায় দাবি করা হয়েছে, সিলফিয়ামের রসের মূল্য কখনও কখনও রুপোর সমপরিমাণ ওজনের কাছাকাছি ছিল।
অর্থাৎ, খাবারের উপাদান থেকে ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত দামি বাণিজ্যিক সম্পদ।
প্রাচীন যুগে গর্ভনিরোধক হিসেবে সিলফিয়াম
সিলফিয়ামকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কারণ অবশ্য এর কথিত গর্ভনিরোধক ব্যবহার। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে গর্ভধারণ এড়াতে এই উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ বা নির্যাস ব্যবহার করা হত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রাচীন নথিতে সিলফিয়ামের গর্ভনিরোধক ব্যবহারের কথা থাকলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় এটি কার্যকর ও নিরাপদ গর্ভনিরোধক ছিল বলে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
অতএব, এটিকে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রাচীন মানুষের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—এই দুই বিষয় এক নয়।
তবু ইতিহাসের দিক থেকে বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ, এটি দেখায় যে হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ পরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজত।
কেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল সিলফিয়াম?
সিলফিয়ামের জনপ্রিয়তাই শেষ পর্যন্ত তার জন্য বিপদ ডেকে এনেছিল বলে গবেষকদের ধারণা।
প্রাচীন বিশ্বে গাছটির ব্যাপক চাহিদা ছিল। খাদ্য, মশলা, সুগন্ধি এবং কথিত ঔষধি ব্যবহারের কারণে বাজারে এর মূল্য ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে গাছটি ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করা হতে থাকে।
সমস্যা ছিল, সিলফিয়াম সম্ভবত সহজে চাষ করা যেত না। ফলে বন্য পরিবেশ থেকে গাছ সংগ্রহের ওপরই মানুষকে নির্ভর করতে হত। অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে এর স্বাভাবিক জনসংখ্যা দ্রুত কমে যেতে পারে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যেই সিলফিয়াম কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে গাছটি পরিণত হয় ইতিহাসের এক রহস্যে।
তুরস্কে মিলল কি সেই হারিয়ে যাওয়া গাছ?
বহু শতাব্দী পর সিলফিয়ামকে ঘিরে আবার আলোচনার সূত্রপাত হয় তুরস্কে একটি বিরল উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে।
ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুত মিসকি মধ্য আনাতোলিয়ার হাসান পর্বত এলাকার একটি বিরল উদ্ভিদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Ferula drudeana।
গবেষণার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, উদ্ভিদটির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রাচীন সিলফিয়ামের বর্ণনার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। এর হলুদ ফুল, উদ্ভিদের সামগ্রিক গঠন এবং শিকড় থেকে পাওয়া সুগন্ধি রজন বিশেষভাবে গবেষকদের নজর কেড়েছে।
এই মিল থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—Ferula drudeana কি তাহলে বহু শতাব্দী আগে হারিয়ে যাওয়া সিলফিয়ামেরই কোনও বংশধর?
প্রাচীন গ্রিকদের হাত ধরে কি তুরস্কে এসেছিল উদ্ভিদটি?
অধ্যাপক মিসকির একটি সম্ভাবনা হল, প্রাচীন গ্রিকরা হয়তো কোনও এক সময় লিবিয়া থেকে এই উদ্ভিদ বা এর কাছাকাছি কোনও প্রজাতি তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলে নিয়ে এসেছিল।
যদি সেই ধারণা সঠিক হয়, তাহলে প্রাচীন সিলফিয়ামের কোনও বংশধর তুরস্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টিকে থাকতে পারে।
এই সম্ভাবনা অবশ্যই গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিলফিয়ামের কোনও নিশ্চিত সংরক্ষিত নমুনা বর্তমানে বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। ফলে প্রাচীন উদ্ভিদটির সঙ্গে আধুনিক কোনও উদ্ভিদের সম্পর্ক যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন।
তাহলে কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটাই সিলফিয়াম?
না। এই মুহূর্তে এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
Ferula drudeana এবং প্রাচীন সিলফিয়ামের মধ্যে বেশ কিছু আকর্ষণীয় মিল পাওয়া গেলেও শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বা প্রাচীন বর্ণনার সঙ্গে মিল থাকলেই দুই উদ্ভিদকে একই বলে প্রমাণ করা যায় না।
সিলফিয়ামের সংরক্ষিত নমুনা না থাকায় সরাসরি ডিএনএ পরীক্ষা করে তুলনা করার সুযোগও নেই। তাই বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থাৎ, ‘হারিয়ে যাওয়া সিলফিয়াম ফিরে এসেছে’—এখনও এটি নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়; বরং একটি আকর্ষণীয় গবেষণার সম্ভাবনা।
ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কি কাজে লাগতে পারে?
যদি ভবিষ্যৎ গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে Ferula drudeana সত্যিই প্রাচীন সিলফিয়ামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তাহলে উদ্ভিদটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও গভীর গবেষণা হতে পারে।
বিশেষ করে এর রজন বা অন্যান্য সক্রিয় উপাদানের শরীরে কী প্রভাব পড়ে, তা বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করতে পারেন। তবে কোনও উদ্ভিদকে গর্ভনিরোধক হিসেবে ব্যবহারের আগে তার কার্যকারিতা, সঠিক মাত্রা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
তাই এখনই এই উদ্ভিদ থেকে ‘প্রাকৃতিক গর্ভনিরোধক’ তৈরি হওয়ার দাবি করা উচিত নয়।
ইতিহাসের রহস্য নাকি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা?
সিলফিয়ামের গল্প আসলে শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া গাছের গল্প নয়। এটি প্রাচীন মানুষের চিকিৎসা জ্ঞান, খাদ্যাভ্যাস, বাণিজ্য এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
একসময় যে গাছের জন্য মানুষ বিপুল অর্থ ব্যয় করত, অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সেই গাছই হয়তো পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর পর তার সম্ভাব্য কোনও আত্মীয়ের সন্ধান পাওয়া তাই বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ—দুই মহলের কাছেই আগ্রহের বিষয়।
তুরস্কের পাহাড়ে পাওয়া Ferula drudeana সত্যিই প্রাচীন সিলফিয়াম কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এই আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দিয়েছে।
হয়তো এটি কেবল একটি বিরল উদ্ভিদ। আবার হয়তো এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া এক উদ্ভিদের সূত্র।
আর সেই রহস্যের সমাধান করতে ইতিহাসের পুরনো নথির সঙ্গে আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞান ও রসায়নকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।


