লিভার আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে, খাবার হজমে সাহায্য করতে এবং বিপাকক্রিয়া ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে লিভারের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
অনেকেই মনে করেন, শুধু মদ্যপান করলেই লিভারের ক্ষতি হয়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা কিছু সাধারণ খাবার এবং কিছু অসচেতন অভ্যাসও নীরবে লিভারের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
ফ্যাটি লিভারকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয়, কারণ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অনেকেই বছরের পর বছর বুঝতেই পারেন না যে তাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমছে।
যদি সময়মতো এই সমস্যা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ধীরে ধীরে তা লিভারের প্রদাহ, সিরোসিস, এমনকি লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শুরু থেকেই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, ফ্লেভারযুক্ত জুস এবং কার্বনেটেড পানীয় সহজেই পাওয়া যায়। এগুলোর বেশিরভাগেই থাকে অতিরিক্ত চিনি, ফ্রুক্টোজ, কৃত্রিম স্বাদ ও সংরক্ষণকারী উপাদান।
অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ শরীরে প্রবেশ করলে তার বড় একটি অংশ লিভারে জমা হয়। দীর্ঘদিন নিয়মিত এসব পানীয় পান করলে লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তাই বাজারের চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে ঘরে তৈরি লেবুর শরবত, লস্যি, ছাছ, ডাবের পানি কিংবা সাধারণ পানি পান করাই বেশি উপকারী।
ফাস্ট ফুড এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। পিৎজা, বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, চিপস, সসেজ, প্রসেসড মিট এবং প্যাকেটজাত নানা খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্স ফ্যাট ও প্রিজারভেটিভ থাকে।
এই ধরনের খাবার নিয়মিত খেলে শুধু ওজনই বাড়ে না, লিভারের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এমন খাদ্যাভ্যাস বজায় থাকলে ফ্যাটি লিভারের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
অনেকেই সামান্য ব্যথা বা জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খেয়ে ফেলেন। বিশেষ করে ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা স্টেরয়েডজাত ওষুধ দীর্ঘদিন বা ভুল মাত্রায় ব্যবহার করলে লিভারের ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ যতই সাধারণ মনে হোক না কেন, নির্ধারিত মাত্রার বেশি বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সেবন করলে তা লিভারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যেকোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করাই নিরাপদ।
অনেকেই মনে করেন ভেষজ বা হারবাল পণ্য মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়।
বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক ভেষজ সাপ্লিমেন্টের গুণগত মান বা কার্যকারিতা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয় না। কিছু ভেষজ উপাদান লিভারের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, কিছু সংক্রামক রোগও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদে লিভারের প্রদাহ, সিরোসিস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এই ঝুঁকি কমাতে সময়মতো টিকা নেওয়া, বিশুদ্ধ পানি পান করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিভার ভালো রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
যেমন—
- অতিরিক্ত চিনি ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন।
- জাঙ্ক ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল এবং আঁশযুক্ত খাবার খান।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- হেপাটাইটিস বি-এর টিকা গ্রহণ করুন এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা স্থূলতার সমস্যা থাকলে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে নিচের উপসর্গ দেখা দিতে পারে—
- সব সময় ক্লান্তি অনুভব করা।
- ডান পাশের উপরের পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা।
- ওজন বেড়ে যাওয়া।
- ক্ষুধামন্দা।
- রক্ত পরীক্ষায় লিভারের এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লিভারের ক্ষতি শুধু মদ্যপানের কারণেই হয়—এমন ধারণা এখন আর সঠিক নয়। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও লিভারের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ শরীর। তাই প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আনুন, নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। সময়মতো সচেতন হলে ফ্যাটি লিভারসহ অনেক গুরুতর লিভারের রোগ সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। কোনো উপসর্গ বা শারীরিক সমস্যা থাকলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

