নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা ৩১ আগষ্ট : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডে একজন সরকারি কর্মচারীর প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেড ১-এ নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জুলাই মাস থেকেই নতুন পে-স্কেলের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আওতায় আসবেন।
বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ধাপ ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেডভেদে বেতন বৃদ্ধির হার ভিন্ন রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-১১ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বেতন বৃদ্ধির সুবিধা রাখা হয়েছে ২০তম গ্রেডে। এই গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা নিম্নগ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তারাও নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বাড়তি আর্থিক সুবিধা পাবেন।
সচিবালয়ে বিকেল ৫টার দিকে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬’ অনুমোদন করা হয়।
বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় পিআইডি সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সামনে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তিনি জানান, বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেডের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার আলাদা রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে।
এই কমিশনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামোর সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের উপযোগী বেতন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল বেতন কমিশনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করা এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করা।
পর্যালোচনার পর কমিটি নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ চূড়ান্ত করে। এরপর সেটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
সরকারি হিসাবে, নতুন জাতীয় বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী সরাসরি সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও নতুন কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্ধারিত অন্যান্য সুবিধাভোগীদের ওপরও এর আর্থিক প্রভাব পড়বে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে।


