আন্তর্জাতিক ডেক্স : ড্রোন ক্যামেরায় নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের ঠিক আগে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে হিমবাহ ধসে পড়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে। মেঘে ঢাকা পাহাড়ের বুক চিরে বরফের বিশাল চাঁই ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের শিলাস্তর ধসে তৈরি হচ্ছে ধুলোর ঘূর্ণি। চিনা এক চিত্রশিল্পীর ড্রোনে ধারণ করা সেই দৃশ্য এখন সামনে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার সকালে। নেপালে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আগেই ওই এলাকায় ড্রোনটি উড়ছিল। তখনই লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে হিমবাহ ধসের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হয়।
লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে যে এলাকায় হিমবাহ ধসে পড়ে, সেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,২০০ মিটার উঁচুতে। সেখান থেকে বরফ ও শিলার বিশাল অংশ প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকার দিকে আছড়ে পড়ে।
ড্রোনের ফুটেজে দেখা যায়, প্রথমে ধীরে ধীরে বরফের বড় বড় অংশ আলগা হয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে। এরপর পাহাড়ের শিলাস্তরেও ধস নামে। বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ নিচে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ধুলোর ঘন মেঘ তৈরি হয়।
মেঘের মাঝখানে সেই ধুলোর কুণ্ডলি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা প্রকৃতির ভয়াবহ শক্তির একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেছে।
হিমবাহের বিশাল অংশ নিচে পড়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ি এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। ওই কম্পনের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা ছিল, ভূগর্ভে মহাদেশীয় পাতের নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের প্রভাবে নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে হড়পা বান তৈরি হতে পারে বলেও মনে করা হয়েছিল।
তবে পরে উপগ্রহচিত্র এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সেই ধারণায় পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল ঘটনা ছিল হিমবাহ ধস। হিমবাহের একটি বড় অংশ পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের উপত্যকায় পড়ে যাওয়ার ফলেই শক্তিশালী কম্পন তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
হিমবাহ ধসের পর নেপালের ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান আসে। বুধবার, ২৬ আগস্ট সকালে এই আকস্মিক বন্যা নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
হিমবাহ, বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ নিচের দিকে নেমে আসায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পাহাড়ি নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ প্রবেশ করায় পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
হড়পা বান সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় নদীর গতিপথের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ তাই এ ধরনের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
চিনা চিত্রশিল্পীর ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এতে হিমবাহ ধসের সরাসরি দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণত দুর্গম ও বিপজ্জনক উচ্চতায় গিয়ে এ ধরনের ঘটনার ভিডিও ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।
ফুটেজে দেখা যায়, লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের আশপাশে মেঘের স্তরের মধ্যে থেকে ধুলোর বিশাল মেঘ উপরে উঠে যাচ্ছে। নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে বরফ ও পাথরের স্তর। পুরো ঘটনাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়।
এই ভিডিও দুর্যোগের কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে হিমবাহের আচরণ, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক ধসের সঙ্গে নদীর বন্যার সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য সহায়ক হতে পারে।
হিমবাহ ধসের পর ভোটেকোশী নদীর হড়পা বানে নেপালে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। সোমবার সকালে নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯০৩টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
দুর্যোগের পর উদ্ধারকারী দলগুলো ব্যাপকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার উদ্ধার অভিযান ষষ্ঠ দিনে প্রবেশ করে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, কাদামাটি এবং ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেপালের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ হড়পা বানের সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকে থাকতে পারেন।
উদ্ধারকারী দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করছে। তবে পুরু কাদার স্তর এবং দুর্গম পাহাড়ি অবস্থানের কারণে প্রতিটি জায়গায় পৌঁছানো সহজ হচ্ছে না।
তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার


