Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img

তৃণমূলে বড় ভাঙন! মমতা নাকি বিদ্রোহীরা—কার হাতে যাবে দলের আসল অধিকার?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালরাজধানীজুড়ে নকল ওষুধের ভয়াবহ সিন্ডিকেট! মিটফোর্ড থেকে সারাদেশে ছড়াচ্ছে মৃত্যুফাঁদ

রাজধানীজুড়ে নকল ওষুধের ভয়াবহ সিন্ডিকেট! মিটফোর্ড থেকে সারাদেশে ছড়াচ্ছে মৃত্যুফাঁদ

সম্প্রতি র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, নয়াবাজার, শ্যামপুর, কদমতলী এবং কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধ এবং ওষুধ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

বাংলাদেশে নকল ও ভেজাল ওষুধের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা অতিক্রম করেছে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নামে বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নকল পণ্য, যা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে মানুষের স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভেজাল ওষুধ সেবনের ফলে রোগীদের শারীরিক জটিলতা বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ উদ্ধার

সম্প্রতি র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, নয়াবাজার, শ্যামপুর, কদমতলী এবং কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধ এবং ওষুধ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, উদ্ধারকৃত নকল ওষুধ এবং উৎপাদন যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই অপরাধ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ওষুধ কেনার সময় সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মিটফোর্ডকেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড, বাবুবাজার ও ইসলামপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে নকল ও ভেজাল ওষুধের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রে অর্ধশতাধিক অসাধু ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা এবং পুরান ঢাকার অলিগলিতে গোপনে পরিচালিত হচ্ছে নকল ওষুধ তৈরির কারখানা। সেখানে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা ওষুধ কোম্পানির পণ্য হুবহু নকল করে উৎপাদন করা হয়। পরে মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেটের মাধ্যমে পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে এসব নকল ওষুধ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

কোন কোন ওষুধ বেশি নকল হচ্ছে?

র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার হওয়া নকল ওষুধের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ওজন কমানোর ওষুধ
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ
  • বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক
  • প্যারাসিটামল সিরাপ ও ট্যাবলেট
  • বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন
  • ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধ
  • অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ওষুধ নকল হওয়ার কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং রোগের জটিলতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: এটি হত্যার শামিল

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জেনেশুনে নিম্নমানের বা নকল ওষুধ বাজারে ছাড়ার অর্থ রোগীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

দেশের বিশিষ্ট কিডনি বিশেষজ্ঞ এবং কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবনের ফলে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া শরীরে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনি নতুন হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে নকল ওষুধ নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

শিশুদের জন্য আরও ভয়াবহ নকল ওষুধের ঝুঁকি

ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিউনেটাল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনির হোসেন জানান, ভেজাল ও নকল ওষুধ শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসব ওষুধ শিশুদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় এবং গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে।

একই হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, অনেক সময় দেখা যায় শিশুদের জ্বর সাময়িকভাবে কমলেও কিছুদিন পর আবার জ্বর ফিরে আসে এবং নতুন উপসর্গ দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে নকল বা ভেজাল ওষুধের প্রভাব থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নকল ওষুধের বিক্রি, সংরক্ষণ ও বিতরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ওষুধ প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আখতার হোসেন বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে নকল ও ভেজাল ওষুধের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওষুধ প্রশাসন নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করছে। তবে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিমুল হালদারও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নকল ওষুধ প্রতিরোধে কী করা প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ওষুধ নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন—

  • নকল ওষুধ উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।
  • অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
  • নিবন্ধিত চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ।
  • উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
  • নকল ওষুধবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

নকল ও ভেজাল ওষুধ শুধু একটি বাণিজ্যিক অপরাধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হুমকি। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যদি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধারাবাহিক অভিযান, চিকিৎসকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সতর্কতা—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াসেই নকল ওষুধের এই ভয়াবহ চক্র ভাঙা সম্ভব। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।