চুল পড়ে মাথার মাঝখান ফাঁকা হয়ে যাওয়া কিংবা সিঁথির দু’পাশে চুল পাতলা হয়ে টাক দেখা দেওয়া এখন আর শুধু পুরুষদের সমস্যা নয়। মহিলাদের মধ্যেও বিভিন্ন কারণে চুল পাতলা হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে চুলের ঘনত্ব বাড়াতে বাজারে নানা ধরনের ট্রিটমেন্ট জনপ্রিয় হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে এক্সোজ়োম হেয়ার থেরাপি।
এই চিকিৎসাকে ঘিরে দাবি করা হয়, চুলের গোড়ায় এক্সোজ়োম প্রয়োগ করে নিষ্ক্রিয় হেয়ার ফলিকলকে সক্রিয় করতে সাহায্য করা সম্ভব। ফলে চুল পড়া কমতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে চুলের ঘনত্বও বাড়তে পারে। তবে এটি কোনও জাদুকরি চিকিৎসা নয় এবং টাক পড়ার কারণ অনুযায়ী এর কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে।
এক্সোজ়োম হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণার মতো গঠন, যা কোষ থেকে নিঃসৃত হয়। এগুলির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন, লিপিড এবং জৈবিক বার্তা বহনকারী উপাদান থাকে। কোষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ক্ষুদ্র কণাগুলির ভূমিকা রয়েছে।
চুলের চিকিৎসায় এক্সোজ়োম ব্যবহারের ধারণা হলো, মাথার ত্বকের নির্দিষ্ট অংশে এগুলি প্রয়োগ করে চুলের ফলিকলের আশপাশের কোষগুলির কার্যকলাপকে প্রভাবিত করা। এর ফলে চুলের বৃদ্ধির পরিবেশ উন্নত হতে পারে বলে আশা করা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এক্সোজ়োম থেরাপিকে সরাসরি ‘স্টেম সেল থেরাপি’ বলা ঠিক নয়। এটি স্টেম সেল থেকে পাওয়া উপাদান ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু স্টেম সেল নিজে শরীরে প্রতিস্থাপন করার চিকিৎসা নয়।
চুলের বৃদ্ধি নির্ভর করে হেয়ার ফলিকলের স্বাভাবিক কার্যকলাপের উপর। বিভিন্ন কারণে এই ফলিকল দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে চুল পাতলা হতে শুরু করে।
এক্সোজ়োম থেরাপির উদ্দেশ্য হলো মাথার ত্বকের পরিবেশে এমন জৈবিক সংকেত পৌঁছে দেওয়া, যা চুলের ফলিকলের কার্যকলাপকে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চুলের বৃদ্ধি এবং ঘনত্বে উন্নতি দেখা যেতে পারে।
তবে সব ধরনের টাক বা চুল পড়ার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যায় না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া ফলিকল থাকলে শুধুমাত্র এই চিকিৎসায় নতুন চুল গজানোর নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
চিকিৎসার আগে রোগীর চুল পড়ার ধরন এবং মাথার ত্বক পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক সাধারণত দেখেন, চুল পড়ার কারণ কী, কতটা চুল পাতলা হয়েছে এবং বংশগতভাবে অ্যালোপেশিয়ার প্রবণতা রয়েছে কি না।
প্রয়োজনে রোগীর অন্যান্য শারীরিক সমস্যা, ওষুধ সেবন এবং হরমোনজনিত বিষয়ও বিবেচনা করা হয়।
এরপর চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক্সোজ়োম প্রয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
একটি পদ্ধতিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুচ ব্যবহার করে মাথার ত্বকের নির্দিষ্ট অংশে এক্সোজ়োম-সমৃদ্ধ প্রস্তুতি প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতিকে অনেক ক্ষেত্রে মেসোথেরাপি বা মাইক্রোইনজেকশন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়।
সুচ খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় সাধারণত প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে না। তবে ব্যথা বা অস্বস্তির মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
আরেকটি পদ্ধতিতে মাইক্রোনিডলিংয়ের মাধ্যমে মাথার ত্বকে খুব ছোট ছোট চ্যানেল তৈরি করা হয়। এরপর সেই জায়গায় এক্সোজ়োম-ভিত্তিক প্রস্তুতি প্রয়োগ করা হয়।
এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো উপাদানগুলিকে মাথার ত্বকের নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করা।
পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে সময় নির্ভর করে ব্যবহৃত পদ্ধতি, চিকিৎসার ক্ষেত্র এবং ক্লিনিকের প্রোটোকলের উপর।
চুল প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শরীরের অন্য অংশ থেকে চুলের ফলিকল সংগ্রহ করে মাথার টাক জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়। এক্সোজ়োম থেরাপিতে সেই ধরনের অস্ত্রোপচার বা চুলের ফলিকল স্থানান্তর করা হয় না।
অর্থাৎ, এটি তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক একটি পদ্ধতি।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। চুল প্রতিস্থাপন এবং এক্সোজ়োম থেরাপি একে অপরের বিকল্প নয়। কারও ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে চুলের গোড়া দুর্বল হওয়ার পর্যায়ে অন্য চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।
এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার।
এক্সোজ়োম থেরাপি নিয়ে প্রচুর প্রচার থাকলেও, একটি সেশন করলেই টাক মাথায় ঘন চুল গজাবে—এমন নিশ্চয়তা বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না।
চুলের বৃদ্ধি ধীরগতির প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সেশনের প্রয়োজন হতে পারে এবং ফলাফল বুঝতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
চুল পড়ার কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বংশগত টাক, হরমোনজনিত সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা মাথার ত্বকের রোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রে চিকিৎসার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।
এই চিকিৎসার খরচ নির্দিষ্ট নয়। ক্লিনিক, ব্যবহৃত এক্সোজ়োম প্রস্তুতি, চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় সেশনের সংখ্যা এবং চুল পড়ার মাত্রার ওপর খরচ পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, একটি সেশনের খরচ আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে চিকিৎসা নেওয়ার আগে শুধু দাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসক এবং ব্যবহৃত পণ্যের নিরাপত্তা ও উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
এক্সোজ়োম থেরাপিকে ঘিরে বাজারে অনেক বড় বড় দাবি রয়েছে। তাই বিজ্ঞাপনে ‘নিশ্চিতভাবে চুল গজাবে’, ‘স্থায়ীভাবে টাক দূর হবে’ বা ‘একবারেই ফল’—এই ধরনের কথা দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত।
চুল পড়ার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাই প্রথম ধাপ। একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা হেয়ার-লস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা নিরাপদ।
বিশেষ করে যদি হঠাৎ প্রচুর চুল পড়তে শুরু করে, মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় গোল হয়ে চুল উঠে যায় কিংবা মাথার ত্বকে চুলকানি, প্রদাহ বা ক্ষত থাকে, তাহলে আগে রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
বর্তমানে এক্সোজ়োম-ভিত্তিক চুলের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে এবং কিছু প্রাথমিক গবেষণায় সম্ভাবনাময় ফল দেখা গেছে। কিন্তু এটিকে এখনও এমন কোনও সর্বজনস্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে দেখা উচিত নয়, যা সব ধরনের টাকের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে কাজ করবে।
তাই এক্সোজ়োম থেরাপিকে সম্ভাবনাময় একটি চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসেবে দেখা ভালো, নিশ্চিত সমাধান হিসেবে নয়।
চুল পড়ার সমস্যা থাকলে প্রথমে কারণ খুঁজে বের করা, তারপর প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার বিকল্পগুলি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

