খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিদ্যুত চুক্তি বাতিল হচ্ছেনা,দাম কমাতে চলছে আলোচনা: জ্বালানিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এখনই বাতিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। কারণ এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে...
Homeগণমাধ্যমগণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সহনশীলতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম: মির্জা ফখরুল

গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সহনশীলতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম: মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে শুধু নির্বাচন আয়োজন বা সরকার পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট নয়। তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, অন্যন্যদের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায়, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমনই মন্তব্য করেছেন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্রের চর্চা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা করা হয়। জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।

তার ভাষায়, গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি একটি সংস্কৃতি। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, রাজনৈতিক আচরণ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমসব ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মতামতের প্রতিফলন। জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং উন্নয়নও টেকসই হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির মহাসচিব বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের কারণে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন ধারা শুরু করেছিলেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে নানা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের কারণে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

তার মতে, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তি বা দলনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সমালোচনাও করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, দলটি মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে।

তার অভিযোগ, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং জনগণের আস্থাও কমেছে।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ব্যর্থ ঘোষণা করা বা পদত্যাগের দাবি তোলা গণতান্ত্রিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, একটি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে সময় লাগে। তাই ধৈর্য ধরে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে সেই মতপার্থক্যের সমাধান সংসদ, সংলাপ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। রাস্তায় নেমে চাপ সৃষ্টি কিংবা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করলে গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে।

বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা।

তিনি বলেন, নিজের মতের সঙ্গে অন্যের মত না মিললেও সেই মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী মতকে দমন করার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

তার মতে, দেশে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রয়োজন। থাকতে হবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিতর্কের সুযোগ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গণতন্ত্রকে অধিক শক্তিশালী করে।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সেমিনারে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন বিএনপির মহাসচিব।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরা। কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলঅম বলেন, শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যম অপরিহার্য। গণমাধ্যমই জনগণের নিকট রাষ্ট্রের কার্যক্রম তুলে ধরেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় অঅনতে ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তার ভাষায়, অনেক গণমাধ্যম মালিক ব্যবসায়িক বা আর্থিক কারণে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। ফলে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে অনীহা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, একটি সংবাদমাধ্যম তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারে, যখন সেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে এবং সাংবাদিকরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সরকার থেকে সরাসরি চাপ না থাকলেও অনেক সাংবাদিক নিজেরাই আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ সেন্সরশিপ অনুসরণ করেন।

তার মতে, ভয় বা অনিশ্চয়তার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করা হয় না। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্য প্রকাশে সাংবাদিকদের আরও সাহসী হতে হবে।

একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান।

গণমাধ্যমকর্মীদের কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির মহাসচিব।

তিনি বলেন, দেশে অনেক সাংবাদিককে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম বেতন, চাকরির নিরাপত্তা এবং অন্যান্য পেশাগত সুবিধাও নিশ্চিত করা হয় না।

তার মতে, সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতাও বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, মালিক ও সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে গণমাধ্যম আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব প্রসঙ্গেও কথা বলেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, এখন সামান্য একটি ভিডিও, বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তের মধ্যে যেকোন মানুষের দীর্ঘদিনের সুনামকে ক্ষুন্য করতে পারে।

তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই না করেই অনেক কিছু ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ বিষয়ে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মত দেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার একটি কঠিন রূপান্তরকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘদিন ধরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়।

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, সরকার, অন্যাণ্য রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল ও গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ সকল সংঘঠন কে আরও ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি মনে করেন,দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়, বরং সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব।

তার মতে, একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম, স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।

আর্কাইভ