রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ফলে অনেক পরিবার স্বস্তির সঙ্গে রান্নার কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে। তবে একই সময়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় সংকট কাটেনি। রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পে গ্যাস না থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাচ্ছেন না চালকরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ব্যবস্থায়, যার ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে অনেক পরিবার রান্না করতে পারেনি। অনেককে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার সকালে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সকালে গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হয়েছে। যদিও সব এলাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি একই রকম নয়, তবুও অনেক পরিবারের জন্য এটি স্বস্তির খবর।
গৃহিণীরা জানান, গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ গ্যাসের চাপ অনেক ভালো ছিল। সকালে নাশতা ও দুপুরের রান্না নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা গেছে। তবে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই উন্নতি যেন সাময়িক না হয় এবং দ্রুত সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ বাড়লেও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্পে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ ছিল না।
তেজগাঁওয়ের আকিজ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথে স্পষ্টভাবে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ফলে সিএনজিচালিত গাড়িগুলোকে ফিরে যেতে হচ্ছে। তবে যেসব গাড়ি এলপিজি ব্যবহারের উপযোগী, সেগুলোতে এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে।
পাম্পে দায়িত্ব পালনকারী এক বিক্রয়কর্মী জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কিছু সময়ের জন্য গ্যাসের সরবরাহ পাওয়া যায়। তখন সীমিত সময়ের জন্য গাড়িতে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার ভোর হওয়ার পর আবারও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও নতুন করে গ্যাস আসেনি। কখন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়েও তারা নিশ্চিত নন।
শুধু তেজগাঁও নয়, রাজধানীর মালিবাগ, বাড্ডা, খিলক্ষেত, গাবতলী, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি পাম্পেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পাম্প পরিচালনাকারীরা জানান, রাতের দিকে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া গেলেও সকালে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দিনের বড় একটি সময় পাম্পগুলো কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
এই অবস্থায় অনেক চালক একটি পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু কোথাও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে যেসব পাম্পে সামান্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছেন না।
প্রাইভেট কারচালক ইউনুস আলী জানান, আগে একবার গ্যাস নিলে সারাদিন নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানো যেত। কিন্তু এখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে কয়েকটি ট্রিপ শেষ করতেই আবার গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং পুনরায় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির অনিশ্চয়তায় প্রতিদিনের আয়ও কমে যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি অটোরিকশাচালকদের ওপর। তাদের অনেকেই জানান, দিনের উল্লেখযোগ্য সময় পাম্পে অপেক্ষা করতে হওয়ায় যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাচ্ছে।
একজন চালক বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যদি পাম্পেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে আয় কমে যাবে। কিন্তু আয় কমলেও মালিককে প্রতিদিন নির্ধারিত জমা দিতে হচ্ছে। ফলে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চালকদের অভিযোগ, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে তাদের অনেকেই আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস না থাকার কারনে কারণে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা তুলনামুলকবাবে কমে গেছে।
যেসব যানবাহন নিয়মিত চলাচল করত, তাদের অনেকেই গ্যাসের অভাবে রাস্তায় নামতে পারছে না। এতে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বেড়ে গেছে।
বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন কাজে বের হওয়া সাধারণ নাগরিকদের দীর্ঘ সময় বাসস্ট্যান্ড কিংবা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু চালক—এমন অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
অনেক যাত্রী জানান, স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি টাকা দাবি করা হচ্ছে। গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বিকল্প না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করছেন।
রাইড শেয়ারিং সেবার গাড়ির চাহিদাও বেড়ে গেছে। তবে গাড়ির স্বল্পতার কারণে সেসব সেবা পেতেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।
সড়কপথে যানবাহনের সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক মানুষ এখন মেট্রোরেলের ওপর নির্ভর করছেন।
সকালের ব্যস্ত সময়ে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। যাত্রীরা বলছেন, সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার চেয়ে মেট্রোরেলে যাতায়াত অনেক দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর গণপরিবহনে এমন সংকটের সময়ে মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, গ্যাস সংকটের কারণে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
অনেক পরিবহন ব্যবসায়ী জানান, নির্ধারিত সময়ে পণ্য পরিবহন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারের মহেশখালী এলাকায় অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে গেছে।
দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই এলএনজি টার্মিনাল। এখান থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ, বাসাবাড়ি এবং পরিবহন—সব খাতেই গ্যাসের চাপ কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব একসঙ্গে বিভিন্ন খাতে পড়ে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কারিগরি ত্রুটি পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে না।
বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ আশাবাদী হলেও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখনও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে চালক, যাত্রী এবং পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

