বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজেদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল স্পেন। ইউরো ও নেশনস লিগ জয়ের পর কোচ লুইস ডে লা ফুয়েন্তের অধীনে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল ‘লা রোহা’। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা লেগেছে। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে গুরুত্বপূর্ণ দুই পয়েন্ট হারিয়েছে স্পেন।
এবার তাদের সামনে সৌদি আরবের কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম লামিনে ইয়ামাল। স্পেনের তরুণ তারকার চোট পরিস্থিতি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে কোচিং স্টাফকে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা রয়েছে নিকো উইলিয়ামসকে নিয়েও।
২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে স্পেন আর কখনও সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। পরবর্তী তিনটি বিশ্বকাপেই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক নিচে ছিল তাদের পারফরম্যান্স। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছিল।
লুইস ডে লা ফুয়েন্তের নেতৃত্বে স্পেন আবারও ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশনস লিগ জয়ের মাধ্যমে দলটি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবেই কাতারে এসেছে। কিন্তু প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সামনে আটকে যায় স্প্যানিশ আক্রমণভাগ।
ফলাফল, হতাশাজনক ড্র এবং গ্রুপ পর্বে চাপের মুখে পড়ে যাওয়া।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই চোটে পড়েছিলেন স্পেনের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল। ধারণা করা হয়েছিল, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
যদিও তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলনে ফিরেছেন, তবুও এখনও পূর্ণ ৯০ মিনিট খেলার মতো অবস্থায় নেই। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলের খোঁজে তাকে মাঠে নামানো হলেও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। বরং ম্যাচের পর জানা গেছে, তার পুরোনো ব্যথা কিছুটা বেড়েছে।
এ কারণে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে প্রথম একাদশে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
স্পেনের আক্রমণভাগের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র নিকো উইলিয়ামসও পুরোপুরি ফিট নন। গত কয়েক বছরে স্পেনের আক্রমণভাগে ইয়ামাল ও নিকোর জুটি ছিল অন্যতম বড় শক্তি।
তাদের গতি, ড্রিবলিং এবং উইং থেকে সুযোগ তৈরির ক্ষমতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে। কিন্তু এই দুই তারকার অনুপস্থিতিতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেনকে অনেকটাই নিষ্প্রভ দেখিয়েছে।
ফরোয়ার্ডদের জন্য কার্যকর বল সরবরাহের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। ফলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে স্প্যানিশরা।
লুইস ডে লা ফুয়েন্তের কৌশলে উইঙ্গারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার পরিকল্পনায় দুই প্রান্তের খেলোয়াড়দের কাজ হলো প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং মাঝখানে জায়গা তৈরি করা।
এই কাজটি সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে করে থাকেন ইয়ামাল ও নিকো। তারা শুধু গতি দিয়েই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন না, বরং বক্সের ভেতরে নিখুঁত পাস দিয়েও গোলের সুযোগ তৈরি করেন।
তাদের অনুপস্থিতিতে স্পেনের আক্রমণে সৃজনশীলতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে সেই দুর্বলতা ফুটে উঠেছিল বারবার।
নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ইয়ামালও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
তার মতে, এখন ঝুঁকি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধীরে ধীরে ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ম্যাচ খেলার মতো অবস্থায় তিনি এখনও পৌঁছাননি, তবে দলের প্রয়োজনে যতটা সম্ভব সময় মাঠে থাকতে প্রস্তুত।
নিকো উইলিয়ামসের অবস্থা সম্পর্কে ইয়ামাল জানিয়েছেন, তার সতীর্থের শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো। তবে দুজনের কেউই চোট নিয়ে ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন।
স্পেন কোচ লুইস ডে লা ফুয়েন্তেও স্বীকার করেছেন যে ইয়ামাল এখনও পূর্ণ ম্যাচ খেলার মতো ফিট নন।
সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তার ফিটনেস পরীক্ষা করা হবে। কোচের ধারণা, ইয়ামাল সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট খেলতে পারবেন। ফলে তাকে প্রথম একাদশে নামানো হবে, নাকি বদলি হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে ভিক্টর মুনোজকে ব্যবহার করার সুযোগও নেই। কারণ লিভারপুলে যোগ দিতে যাওয়া এই তরুণ ফুটবলারও বর্তমানে চোটের কারণে মাঠের বাইরে।
স্পেনের সমস্যা শুধু আক্রমণভাগেই সীমাবদ্ধ নয়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঝমাঠও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো এখনও পুরোপুরি ফিট নন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত খেলার বাইরে ছিলেন। শেষ কয়েক মাসে হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন, তাও বেশিরভাগ সময় বদলি হিসেবে।
যদিও দলের শেষ অনুশীলনে তাকে দেখা গেছে, তবুও ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এক সময় সৌদি আরবকে সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশটির ফুটবল মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে সৌদি গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়ায়িস দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ সৌদিকে মূল্যবান পয়েন্ট এনে দিয়েছে।
ফলে স্পেনের জন্য এই ম্যাচ মোটেও সহজ হবে না। বিশেষ করে আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্ররা পুরোপুরি ফিট না থাকায় চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করার পর স্পেন এখন কঠিন সমীকরণের মুখে। সৌদি আরবের বিপক্ষে যদি আবারও পয়েন্ট হারায়, তাহলে শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের জন্য পরিস্থিতি ‘বাঁচা-মরার’ লড়াইয়ে পরিণত হবে।
এই কারণেই আটলান্টায় অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচে জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবছে না স্পেন। তবে সেই লক্ষ্য পূরণে লামিনে ইয়ামালের ফিটনেস বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—সৌদি আরবের বিপক্ষে কি প্রথম একাদশে দেখা যাবে লামিনে ইয়ামালকে, নাকি তাকে আবারও বদলি হিসেবেই ব্যবহার করবেন কোচ লুইস ডে লা ফুয়েন্তে? উত্তর মিলবে মাঠেই, তবে স্পেন সমর্থকদের দুশ্চিন্তা যে এখনও কাটেনি, তা বলাই যায়।

