রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ—সব প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ফুটবল অঙ্গনেও পড়লেও, ইরানের কোচ ও খেলোয়াড়রা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁদের মূল লক্ষ্য শুধুই মাঠের খেলায় সাফল্য অর্জন করা।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে ইরান দল, বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের অপেক্ষা
দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জানা গেছে, শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এমন এক সংবেদনশীল সময়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রেখেছে ইরানের ফুটবল দল।
আগামী ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে দলটির ওপর বাড়তি মানসিক চাপ কাজ করছে বলে স্বীকার করেছেন ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোয়েই। তবে এই চাপকে জয় করেই সফল সূচনা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী এই দল।
ভিসা জটিলতায় ব্যাহত হয়েছে ইরানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের কোচ আমির ঘালেনোয়েই দলের প্রস্তুতির নানা বাধার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে শুরু করতে হয়েছে।
আমির বলেন, “ভিসা পেতে দেরি হওয়ায় আমরা সবার শেষে প্রস্তুতি শুরু করতে বাধ্য হয়েছি। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ শিবিরও পরিবর্তন করতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।”
তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এসব সমস্যাকে পেছনে ফেলে এখন পুরো দল শুধুমাত্র ফুটবলে মনোযোগ দিচ্ছে।
তার ভাষায়, “আমরা এখানে ভালো ফুটবল খেলতে এসেছি এবং জয় অর্জন করাই আমাদের লক্ষ্য। মাঠের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করছি না। আমাদের পুরো মনোযোগ এখন ফুটবলের ওপর।”
রাজনৈতিক উত্তেজনার ছায়া বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতেও
বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা দেখা গেছে। প্রথমদিকে ইরানের প্রস্তুতি ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেটি সরিয়ে মেক্সিকোতে স্থানান্তর করা হয়।
এছাড়া ইরানের সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ কিছু টিকিট বাতিল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বকাপের পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ম্যাচ ঘিরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা, নিরাপত্তা জোরদার
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের ম্যাচকে ঘিরে স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছেন দেশটির কিছু সমর্থক। এ কারণে আয়োজক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দর্শকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেও বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
“ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই” – আমির ঘালেনোয়েই
ইরানের কোচ আমির ঘালেনোয়েই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, রাজনীতি ও খেলাধুলাকে আলাদা রাখা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমরা রাজনীতিবিদ নই। ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। আমাদের কাজ মাঠে নেমে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করা।”
তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে খেলাধুলাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দীর্ঘদিনের দাবিকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
চাপের মধ্যেও আত্মবিশ্বাসী মেহদি তারেমি
ইরানের তারকা ফুটবলার মেহদি তারেমিও স্বীকার করেছেন যে দলটি চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে তিনি এটাও মনে করেন, শুধু ইরান নয়, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী আরও অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
তিনি বলেন, “এটা শুধু ইরানের সমস্যা নয়। আরও অনেক দেশ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসে আমরা চাপ অনুভব করছি, কিন্তু পেশাদার ফুটবলার হিসেবে সেই চাপ সামলে খেলতে হবে।”
তারেমির মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করেই বড় মঞ্চে সফল হতে হয়।
কঠিন পরিস্থিতিতেও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ইরান কোচ
বিশ্বকাপের আগে বারবার পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হওয়ায় দলের প্রস্তুতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। তবুও নিজের দলের সামর্থ্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন আমির ঘালেনোয়েই।
তিনি বলেন, “দেরিতে এখানে আসার কারণে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় কম পেয়েছি। আমাদের দুইবার শিবির পরিবর্তন করতে হয়েছে। তবে কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে আমরা অভ্যস্ত। দলের ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে।”
এই আত্মবিশ্বাসই বিশ্বকাপে ইরানের জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের দিকে নজর ফুটবল বিশ্বের
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান দলকে দেশ ছাড়তে হবে। তবে সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তির সম্ভাবনার পর সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে কি না, সেদিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহল।
যদি নীতিগত পরিবর্তন আসে, তাহলে তা শুধু ইরানের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কূটনীতির ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস গড়ার প্রত্যাশা
রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিরাপত্তা শঙ্কার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও ইরানের ফুটবল দল নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য বিশ্বকাপে ইতিবাচক ফল অর্জন করা এবং দেশের সমর্থকদের গর্বিত করা।
এশিয়ার এই দলটি বিশ্বাস করে, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, সব বাধা অতিক্রম করে বিশ্বকাপের মঞ্চে কতটা সফল হতে পারে ইরান।

