ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বব্যাপী আবেগ, সংস্কৃতি এবং উদযাপনের এক অনন্য মেলবন্ধন। ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে কানাডা তাদের যাত্রা শুরু করেছে এক বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। টরন্টোতে অনুষ্ঠিত এই জমকালো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জনপ্রিয় কানাডিয়ান গায়ক মাইকেল বুবলে, যার অসাধারণ পরিবেশনা হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শুক্রবার সকাল থেকেই টরন্টো শহর যেন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত হয়। হাজার হাজার কানাডিয়ান সমর্থক শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে একত্রিত হয়ে আনন্দ মিছিলের মাধ্যমে স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হন। জাতীয় পতাকা, দলীয় জার্সি এবং স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ডাউনটাউন টরন্টো।
বিশ্বকাপে নিজেদের দেশের প্রথম ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল তুমুল উত্তেজনা। স্টেডিয়ামের বাইরে থেকেই উৎসবের আমেজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা ম্যাচ শুরুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
ম্যাচ শুরুর আগে আয়োজিত শিল্প-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কানাডার বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা হয়। এই অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন জনপ্রিয় শিল্পী উইলিয়াম প্রিন্স। তার পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
পরবর্তীতে মঞ্চে আসেন খ্যাতিমান গায়িকা জেসি রেয়েজ। বিশাল আকৃতির বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা উপহার দেন, যা দর্শকদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে কানাডার ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন ৫০ বছর বয়সী জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মাইকেল বুবলে। মাঠে অংশগ্রহণকারী সব দলের পতাকা প্রদর্শনের পর তিনি সেন্টার সার্কেলে দাঁড়িয়ে তার ২০২২ সালের জনপ্রিয় গান ‘Bring It On Home To Me’ পরিবেশন করেন।
তার আবেগঘন এবং শক্তিশালী পরিবেশনা পুরো স্টেডিয়ামকে এক অনন্য আবহে রূপান্তরিত করে। হাজারো দর্শক করতালি এবং উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে তাকে অভিনন্দিত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন কানাডিয়ান গায়িকা অ্যালানিস মরিসেট। সাধারণত ক্যামেরার সামনে কম উপস্থিত হওয়া এই শিল্পী বিশ্বকাপের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে কানাডার জাতীয় সঙ্গীত ‘ও কানাডা’ পরিবেশন করেন।
তার হৃদয়স্পর্শী পরিবেশনা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে এবং পুরো স্টেডিয়ামে এক গর্বের অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিখ্যাত বেহালাবাদক আলেকসান্দার গাজিক।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হিসেবে অংশগ্রহণ করছে কানাডা। টরন্টোতে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুখোমুখি হয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে স্বাগতিকরা।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া কানাডা এবার ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইতিহাস গড়তে চায়।
কানাডার আগে বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক পর্দা ওঠে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম এস্তাদিও আজতেকা-তে। বিশ্বখ্যাত পপ তারকা শাকিরার বর্ণাঢ্য পরিবেশনা টুর্নামেন্টের সূচনাকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
তারকাখচিত সেই অনুষ্ঠান বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পুরো টুর্নামেন্টের জন্য উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে।
উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় পায় মেক্সিকো। উত্তেজনাপূর্ণ এই ম্যাচে তিনজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখায় নাটকীয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে মেক্সিকোর এই জয় টুর্নামেন্টে তাদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
তবে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশদের সংঘর্ষের ঘটনা দেখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের প্রতিহত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
এছাড়াও, স্টেডিয়ামের বাইরে এক ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হন, যদিও ঘটনাটি বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল না।
মেক্সিকোর ঘটনার বিপরীতে টরন্টোতে অনুষ্ঠিত কানাডার উদ্বোধনী আয়োজনে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
মাইকেল বুবলের ঝলমলে পরিবেশনা এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস কানাডার বিশ্বকাপ আয়োজনকে সফলতার নতুন মাত্রা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ফক্স মাইকেল বুবলের পরিবেশনার বেশিরভাগ অংশ সরাসরি সম্প্রচার না করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সমালোচনা দেখা যায়। দর্শকরা অভিযোগ করেন, তারা কেবল কয়েকটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্য দেখতে পেরেছেন।
একইভাবে, মেক্সিকোতে শাকিরার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও ফক্স একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
শুক্রবারই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ে।
এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা ক্যাটি পেরি। এছাড়াও জনপ্রিয় হিপ-হপ শিল্পী ফিউচারও অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচের পর আগামী সপ্তাহে ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের মুখোমুখি হবে কানাডা। এরপর ২৪ জুন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড।
ঘরের মাঠে সমর্থকদের বিপুল সমর্থনকে পুঁজি করে এবারের বিশ্বকাপে স্মরণীয় সাফল্য অর্জনের আশা করছে কানাডা।
মাইকেল বুবলের প্রাণবন্ত পরিবেশনা, অ্যালানিস মরিসেটের আবেগঘন জাতীয় সঙ্গীত এবং হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে টরন্টোতে কানাডার বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা হয়ে উঠেছে এক স্মরণীয় অধ্যায়। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে সহ-আয়োজক হিসেবে কানাডার এই জমকালো আয়োজন প্রমাণ করেছে যে, কেবল মাঠের লড়াই নয়, সংস্কৃতি ও উদযাপনও এই টুর্নামেন্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখন দেখার বিষয়, মাঠের পারফরম্যান্সেও কানাডা কি তাদের সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হয় কি না।

