আজকাল শহরে বের হলেই মনে হয় যেন আগুনের মধ্যে হাঁটছি। এর পেছনে একটা সহজ কারণ আছে। দিনের বেলা রাস্তা, কংক্রিটের বাড়ি, দালান—সব সূর্যের তাপ শুষে নেয়। তারপর রাতে সেই তাপ আবার ছেড়ে দেয়। ফলে শহর গরমই থাকে, এমনকি রাতেও।
এই কারণেই ইট-পাথরে ভর্তি শহরগুলোতে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। শুধু গরম না, তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। তাই অনেক শহরে এখন বেশি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এখানে একটা বড় ভুল ধারণা আছে—যে কোনো গাছ লাগালেই গরম কমবে। বাস্তবটা কিন্তু একটু আলাদা।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু প্রচুর গাছ লাগালেই কাজ হয় না। বরং ভুলভাবে গাছ লাগালে গরম আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, জার্মানির মিউনিখ এবং হংকং শহরে বিজ্ঞানীরা একটা পরীক্ষা চালান। তারা দেখতে চেয়েছিলেন, শহরের গাছপালা আসলে মানুষের গরম লাগার অনুভূতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলে।
এই গবেষণায় শুধু তাপমাত্রা নয়, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা হয়েছে—যেমন বাতাসে আর্দ্রতা, হাওয়া চলাচল, আর ‘রেডিয়ান্ট হিট’ বা চারপাশ থেকে আসা তাপ।
ধরো তুমি রোদে দাঁড়িয়ে আছো। শুধু বাতাস না, চারপাশের রাস্তা, দেয়াল, গাড়ি—সব জায়গা থেকে তাপ তোমার শরীরে আসছে। এটাকেই বলে রেডিয়ান্ট হিট।
গবেষকরা দেখেছেন, এই তাপই আমাদের অস্বস্তির বড় কারণ। আর গাছের সঠিক ব্যবহার এই তাপ অনেক কমিয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টা এখানে—যে শহরে বড় গাছের সঙ্গে ছোট গাছ, ঝোপ আর ঘাস মিলিয়ে সব ধরনের সবুজ রয়েছে, সেখানে গরম অনেক কম লাগে।
অন্যদিকে, যেখানে শুধু বড় বড় গাছ আছে, সেখানে গরম কমার বদলে অনেক সময় অস্বস্তি বাড়ে।
মানে সহজভাবে বললে—
শুধু বড় গাছের সারি বানালেই হবে না, বরং একটা ‘মিশ্র সবুজ পরিবেশ’ তৈরি করতে হবে।
মেলবোর্নে দেখা গেছে, যেখানে গাছের ছায়া আছে, সেখানে পরিবেশ অনেক আরামদায়ক লাগে।
খোলা রাস্তার তুলনায় গাছপালায় ঘেরা জায়গায় দাঁড়ালে শরীর অনেক ঠান্ডা থাকে। যদিও তাপমাত্রার বড় পার্থক্য সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু শরীরে লাগা তাপ অনেক কমে যায়।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—
গাছের ছায়াযুক্ত জায়গায় মানুষের শরীরে শোষিত তাপ ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম হতে পারে।
মিউনিখে বিষয়টা আরও পরিষ্কার। সেখানে গরমের দুপুরে খোলা রাস্তার তুলনায় গাছ, ঝোপ আর ঘাসে ঢাকা জায়গায় তাপমাত্রা প্রায় ৮ ডিগ্রি কম পাওয়া গেছে।
মানে শুধু ছায়া না, নিচের ঘাস আর চারপাশের সবুজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হংকংয়ে গাছের ছায়া থাকলেও সব জায়গায় স্বস্তি পাওয়া যায় না। কারণ সেখানে বাতাসে আর্দ্রতা অনেক বেশি।
গাছ থেকে জলীয় বাষ্প বের হয়, যা শুষ্ক জায়গায় ভালো কাজ করে। কিন্তু যেখানে আগেই আর্দ্রতা বেশি, সেখানে এই বাষ্প অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনেকেই ভাবেন, বেশি গাছ মানেই বেশি ঠান্ডা। কিন্তু বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে।
যেমন—
যদি খুব ঘন বড় গাছ থাকে, তাহলে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে গরম বাতাস আটকে থাকে এবং দূষণও বের হতে পারে না।
এই কারণে কিছু শহরে গাছ থাকা সত্ত্বেও গরম কমে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—তাহলে কীভাবে গাছ লাগালে সত্যিই উপকার পাওয়া যাবে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিকল্পনা করেই গাছ লাগাতে হবে।
যেমন—
শুধু বড় গাছ না, সঙ্গে ঝোপ আর ছোট গাছ রাখতে হবে
মাটিতে ঘাস রাখতে হবে
গাছের ফাঁকে ফাঁকে খোলা জায়গা রাখতে হবে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে
এইভাবে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সবুজ পরিবেশ তৈরি করলে তাপমাত্রা কমানো সম্ভব।
আগে শহরে গাছ লাগানো হতো শুধু সৌন্দর্যের জন্য। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
এখন লক্ষ্য হচ্ছে—
কীভাবে শহরের তাপমাত্রা কমানো যায়
কীভাবে মানুষকে আরাম দেওয়া যায়
এই গবেষণা প্রশাসনকে সঠিক পরিকল্পনা নিতে সাহায্য করতে পারে।
একটা সহজ কথা মনে রাখো—
গাছ অবশ্যই লাগাতে হবে, কিন্তু যেভাবে-সেভাবে না।
ঠিক জায়গায়, ঠিক ধরনের গাছ লাগালে শহরের গরম অনেকটাই কমানো সম্ভব।
না হলে উল্টো ফলও হতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের শহরকে ঠান্ডা রাখতে হলে এখন থেকেই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।

