বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং সেই সময়ের প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) যে প্রতিবেদনে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছিল, সেই তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইনি প্রতিনিধিরা।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক আইনি উপদেষ্টা ওই মৃত্যুর সংখ্যাকে “ভিত্তিহীন”, “অতিরঞ্জিত” এবং “তথ্যগতভাবে ভুল” বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ওই সংখ্যা জনসমক্ষে প্রত্যাহার ও সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ এবং সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র ৪৬ দিনের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
এই তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয় এবং তৎকালীন সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
তবে শেখ হাসিনার আইনি দল এখন দাবি করছে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত মৃত্যুর সংখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তা যাচাই-বাছাই ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী স্টিভেন পাউলেস কেসি গত ২৮ মে শেখ হাসিনার পক্ষে এই চিঠি পাঠান।
চিঠিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিজস্ব নথিপত্র বিশ্লেষণ করলেও ১,৪০০ মৃত্যুর দাবির পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং সরকারি তথ্যই জাতিসংঘের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আইনি দলের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে এই সংখ্যা প্রচার করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শেখ হাসিনার আইনি প্রতিনিধিরা তাদের দাবির সমর্থনে বাংলাদেশের সরকারি গেজেটের তথ্য উল্লেখ করেছেন।
গত বছরের ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত বা শহীদ হিসেবে মোট ৮৩৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সংখ্যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ১,৪০০ জনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
আইনি দলের মতে, সরকারি নথির এই তথ্যই প্রমাণ করে যে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সংখ্যা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি দেখানো হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ীও নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৫০ জন ছিল।
শেখ হাসিনার আইনি উপদেষ্টারা দাবি করেন, যদি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে তদন্ত পরিচালনা করা হয়, তাহলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা জাতিসংঘের দাবির তুলনায় আরও কম হতে পারে।
এই যুক্তি তুলে ধরে তারা জাতিসংঘের তথ্য পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
চিঠিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগও আনা হয়েছে। শেখ হাসিনার আইনি দলের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তাদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা পরিচালনার নির্দেশদাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে এই সংখ্যাকে প্রচার করা হয়।
আইনি দল মনে করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বর্ণনা প্রতিষ্ঠার জন্য মৃত্যুর সংখ্যা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
শুধু নিহতের সংখ্যা নয়, জাতিসংঘের তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শেখ হাসিনার আইনি টিম।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তটি পরিচালিত হয়েছিল ড. Muhammad Yunus-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে। ফলে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ রয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যা তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চিঠির সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Asaduzzaman Khan-এর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়।
শেখ হাসিনার আইনজীবীরা শুরু থেকেই ওই বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করে আসছেন। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতার ঘাটতি ছিল এবং এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে।
চিঠির শেষ অংশে ওএইচসিএইচআর-এর কাছে সরাসরি আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে ১,৪০০ নিহতের তথ্যটি পুনরায় যাচাই করা হয় এবং যদি তথ্যগত অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন বা প্রত্যাহার করা হয়।
স্টিভেন পাউলেসের মতে, জাতিসংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উচিত যাচাইবিহীন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা। তিনি মনে করেন, ভুল তথ্য দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক জনমত এবং মানবাধিকার বিষয়ক আলোচনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি

