Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeমেডিকেল জার্নালকিছু ভাবার আগেই কি সিদ্ধান্ত নেয় মস্তিষ্ক? স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন গবেষণায় উঠে এল...

কিছু ভাবার আগেই কি সিদ্ধান্ত নেয় মস্তিষ্ক? স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন গবেষণায় উঠে এল চমকপ্রদ তথ্য

মস্তিষ্ক একটি রিলে দৌড়ের মতো পদ্ধতিতে কাজ করে। অর্থাৎ, বাইরের পরিবেশ থেকে পাওয়া তথ্য বা উদ্দীপনা প্রথমে সংবেদনশীল অংশে পৌঁছায়। এরপর ধাপে ধাপে সেই তথ্য মস্তিষ্কের উচ্চতর অংশ, বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্সে পাঠানো হয়।

মানুষ সাধারণত মনে করে, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং তারপর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা এই দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গবেষকদের দাবি, আমরা সচেতনভাবে ভাবতে শুরু করার আগেই মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে পারে।

এই আবিষ্কার শুধু মানব মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গবেষণার পথও বদলে দিতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মস্তিষ্ক একটি রিলে দৌড়ের মতো পদ্ধতিতে কাজ করে। অর্থাৎ, বাইরের পরিবেশ থেকে পাওয়া তথ্য বা উদ্দীপনা প্রথমে সংবেদনশীল অংশে পৌঁছায়। এরপর ধাপে ধাপে সেই তথ্য মস্তিষ্কের উচ্চতর অংশ, বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্সে পাঠানো হয়।

ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সংবেদনশীল অংশের কাজ ছিল কেবল তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করা। সেখানে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না বলেই এতদিন মনে করা হতো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের কাজের ধরনও অনেকটা এমন। সেন্সর তথ্য সংগ্রহ করে, সেই তথ্য বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে মূল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পৌঁছায়, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তবে মস্তিষ্কের কাজ হয়তো এতটা সরল নয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের প্রাথমিক সংবেদনশীল অংশ শুধু তথ্য গ্রহণই করে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

গবেষকদের মতে, কোনও উদ্দীপনা বা তথ্য সম্পূর্ণভাবে উচ্চতর কর্টেক্সে পৌঁছানোর আগেই মস্তিষ্কের নিম্নস্তরের অংশ সিদ্ধান্তের প্রাথমিক ধাপ শুরু করে দেয়। অর্থাৎ, আমরা যখন কোনও বিষয় নিয়ে সচেতনভাবে ভাবছি বলে মনে করি, তখন হয়তো মস্তিষ্ক তার আগেই সিদ্ধান্তের পথে এগিয়ে গেছে।

এই ধারণা প্রচলিত স্নায়ুবিজ্ঞানের তত্ত্বের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ ছিল ইঁদুরের উপর পরিচালিত একটি বিশেষ পরীক্ষা।

সাধারণত কোনও নির্দিষ্ট কাজ শেখানোর জন্য পরীক্ষাগারে ইঁদুরদের কয়েক সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সেই পথ অনুসরণ করেননি।

তারা একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে একটি ভাসমান চলমান পৃষ্ঠের উপর ইঁদুরদের চলাফেরা করতে দেওয়া হয়। চারপাশের মোটরচালিত দেয়াল ইঁদুরের গতিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নড়াচড়া করছিল।

পরীক্ষার সময় ইঁদুরের মুখের অধিকাংশ গোঁফ কেটে দেওয়া হয়। কেবল দুটি সমান গোঁফ রাখা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইঁদুর তাদের গোঁফ ব্যবহার করে স্পর্শের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।

অবিশ্বাস্যভাবে দেখা যায়, মাত্র দুটি গোঁফ ব্যবহার করেই ইঁদুর খুব দ্রুত আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং প্রায় নিখুঁতভাবে দিক নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।

ইঁদুরের প্রতিটি গোঁফ মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই অংশকে বলা হয় ব্যারেল কর্টেক্স।

গোঁফ থেকে আসা স্পর্শসংক্রান্ত সংকেত প্রথমে ব্যারেল কর্টেক্সে পৌঁছায়। আগে ধারণা করা হতো, এটি কেবল তথ্য গ্রহণের কেন্দ্র।

কিন্তু গবেষকরা যখন শত শত নিউরনের কার্যকলাপ রেকর্ড করেন, তখন দেখা যায় যে ব্যারেল কর্টেক্সের সংকেত অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগেই ইঙ্গিত দিচ্ছে ইঁদুর কোন দিকে যাবে।

অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাথমিক ইঙ্গিত মস্তিষ্কের এই সংবেদনশীল অংশ থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল।

স্নায়ুবিজ্ঞানের একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন তথ্য ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। নির্দিষ্ট একটি সীমায় পৌঁছালে মস্তিষ্ক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

এতদিন মনে করা হতো, এই চূড়ান্ত পর্যায়টি মস্তিষ্কের উচ্চতর অংশে সংঘটিত হয়। কিন্তু নতুন গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, সিদ্ধান্ত তৈরির কাজ আসলে অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়।

তথ্য সংগ্রহ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়তো আলাদা দুটি ধাপ নয়, বরং একইসঙ্গে চলমান একটি প্রক্রিয়া।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মস্তিষ্ককে আর শুধুমাত্র একমুখী তথ্যপ্রবাহের ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, উচ্চতর কর্টেক্স এবং নিম্নতর সংবেদনশীল অংশের মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান হয়। অর্থাৎ, তথ্য শুধু নিচ থেকে ওপরে যায় না, ওপর থেকেও নিচে ফিরে আসে।

ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি একটি চক্রাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো কাজ করে।

এই মডেল অনুযায়ী, অনুভব করা এবং চিন্তা করা—দুই প্রক্রিয়া একই সময়ে ঘটে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে সিদ্ধান্তকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

এই গবেষণার ফলাফল যতই আকর্ষণীয় হোক, বিজ্ঞানীদের একটি অংশ এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

কারণ পরীক্ষাটি সম্পূর্ণভাবে ইঁদুরের উপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক অনেক বেশি জটিল এবং উন্নত। তাই ইঁদুরের ক্ষেত্রে পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের উপর প্রযোজ্য হবে, এমন দাবি করা এখনই সম্ভব নয়।

গবেষকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানব আচরণবিজ্ঞান গবেষণায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যদি প্রমাণিত হয় যে মস্তিষ্ক সচেতন চিন্তার আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ শুরু করে, তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, বিচারবোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রচলিত ধারণাগুলিও নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।

একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ মস্তিষ্কের প্রকৃত কাজের ধরন বুঝতে পারলে আরও উন্নত ও মানবসদৃশ এআই ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে।

নতুন এই গবেষণা মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এই তিনটি ধাপ হয়তো আলাদা নয়, বরং একসঙ্গে চলমান একটি জটিল প্রক্রিয়া। যদিও গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মানুষের ক্ষেত্রে এর সত্যতা যাচাই বাকি, তবুও এটি স্নায়ুবিজ্ঞানের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

হয়তো ভবিষ্যতে আমরা জানতে পারব, কোনও বিষয়ে সচেতনভাবে ভাবতে শুরু করার আগেই আমাদের মস্তিষ্ক সিদ্ধান্তের পথে অনেকটা এগিয়ে যায়।