Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeএক্সক্লুসিভআইনস্টাইন কেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি? ইতিহাসের এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রস্তাবের...

আইনস্টাইন কেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি? ইতিহাসের এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রস্তাবের অজানা গল্প

জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইন ১৯৩৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। সে বছর অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসেন এবং জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়। ডেভিড বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে আইনস্টাইনকে একটা চিঠি লিখেছিলেন মি. ইবন।

বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়, যেখানে একজন বিজ্ঞানীকে একটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু সেই বিরল ঘটনাই ঘটেছিল বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনে। ১৯৫২ সালে নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। তবে সবার বিস্ময় জাগিয়ে তিনি সেই সম্মানজনক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

প্রশ্ন হলো, কেন এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ পদ নিতে চাননি আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তিত্ব? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক দর্শন এবং দায়িত্ববোধের মধ্যে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম এবং নতুন প্রেসিডেন্টের খোঁজ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ব্রিটিশ শাসিত প্যালেস্টাইনকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব অনুমোদন করে—একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য।

এর পর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও জায়নবাদী নেতা খাইম ভাইৎসম্যান। তিনি শুধু একজন বায়োকেমিস্টই ছিলেন না, ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখও ছিলেন।

কিন্তু ১৯৫২ সালে ভাইৎসম্যানের মৃত্যু হলে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন ইসরায়েলের নেতৃত্ব এমন একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বকে খুঁজছিল, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির মর্যাদা আরও বাড়াতে পারবেন।

কেন আইনস্টাইনের নাম সামনে আসে?

আলবার্ট আইনস্টাইন তখন শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বব্যাপী পরিচিত এক নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতীক। তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব তাঁকে বিজ্ঞানজগতের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।

এছাড়া তিনি ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন ইহুদি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার মনে করেছিল, আইনস্টাইনকে প্রেসিডেন্ট করা গেলে দেশটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।

তখন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবন আনুষ্ঠানিকভাবে আইনস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।

আইনস্টাইনের বিনয়ী কিন্তু দৃঢ় প্রত্যাখ্যান

আইনস্টাইনের বয়স তখন ৭৩ বছর। তিনি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে বসবাস করছিলেন এবং গবেষণার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

প্রস্তাব পাওয়ার পর তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে তিনি এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করেন না।

চিঠিতে আইনস্টাইন লিখেছিলেন যে তিনি সারাজীবন বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। মানুষের প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেওয়া, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় দপ্তরের কাজ পরিচালনার মতো দক্ষতা তাঁর নেই।

তিনি মনে করতেন, একজন রাষ্ট্রপতির জন্য যে ধরনের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণ প্রয়োজন, তা তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত। তাই তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি।

ইহুদি জনগণের প্রতি ছিল গভীর আবেগ

প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও আইনস্টাইন কখনও ইহুদি সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবেননি।

বরং তিনি স্বীকার করেছিলেন যে জীবনের বিভিন্ন সময়ে ইহুদিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক বন্ধন। বিশেষ করে ইউরোপে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন এবং নাৎসি জার্মানির উত্থানের পর তিনি আরও বেশি করে এই সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

তবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেকটাই মানবতাবাদী। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের চেয়ে মানবাধিকার ও শান্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জায়নবাদকে সমর্থন করলেও ছিলেন ভিন্নধারার চিন্তাবিদ

আইনস্টাইন জায়নবাদী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তবে তাঁর চিন্তাধারা মূলধারার রাজনৈতিক জায়নবাদ থেকে কিছুটা আলাদা ছিল।

তিনি এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন যেখানে আরব ও ইহুদিরা সমান অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারবে। তিনি দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণাকে গুরুত্ব দিতেন এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

এই কারণে অনেক সময় তাঁর অবস্থান ইসরায়েলের কঠোর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে মিলত না।

ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সমালোচক ছিলেন

আইনস্টাইন অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। তিনি যেসব বিষয়ে নৈতিক আপত্তি অনুভব করতেন, সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিতেন।

১৯৪৮ সালে তিনি এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ইহুদি বুদ্ধিজীবী একটি খোলা চিঠিতে মেনাখেম বেগিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের মতে, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

এই অবস্থান দেখায় যে আইনস্টাইন সবসময় নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপরে স্থান দিয়েছিলেন।

বেন-গুরিয়নেরও ছিল কিছু শঙ্কা

মজার বিষয় হলো, অনেক ইতিহাসবিদের মতে ডেভিড বেন-গুরিয়ন নিজেও আইনস্টাইনের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্সি নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন।

কারণ আইনস্টাইন ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং নিজের মত প্রকাশে অত্যন্ত সাহসী। তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতার নির্দেশ মেনে চলার মানুষ ছিলেন না। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলে তিনি সরকারের নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন, যা রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারত।

এমনকি বেন-গুরিয়ন নাকি তাঁর ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, আইনস্টাইন যদি সত্যিই রাজি হয়ে যান, তাহলে সেটি সরকারের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।

আইনস্টাইনের সিদ্ধান্ত ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আইনস্টাইনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে ক্ষমতা বা মর্যাদা সব মানুষের কাছে সমান আকর্ষণীয় নয়। অনেকেই ক্ষমতার জন্য জীবন কাটান, কিন্তু আইনস্টাইন উল্টো পথ বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি বুঝেছিলেন যে একজন মহান বিজ্ঞানী হওয়া আর একজন সফল রাষ্ট্রনেতা হওয়া এক বিষয় নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধই তাঁকে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

এই সিদ্ধান্ত তাঁর বিনয়, সততা এবং আত্মসমালোচনার ক্ষমতার এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে আজও আলোচিত।

শেষ কথা

১৯৫২ সালে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েও আলবার্ট আইনস্টাইন তা গ্রহণ করেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁর নেই। যদিও তিনি ইহুদি জনগণের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী ছিলেন এবং ইসরায়েল প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করেছিলেন, তবুও তিনি নিজের নৈতিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার প্রতি সৎ থেকেছেন।

ফলে ইতিহাসে আইনস্টাইন শুধু একজন মহান বিজ্ঞানী হিসেবেই নয়, ক্ষমতার লোভ থেকে দূরে থাকা এক বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত আজও নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং ব্যক্তিগত সততার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।