সুন্দরবনের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের রাজত্ব, বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং নোনাজলের খাঁড়িতে ওত পেতে থাকা কুমিরের ছবি। বহু বছর ধরেই একটি প্রচলিত ধারণা—সুন্দরবনের জলে নামলে কুমির, আর ডাঙায় উঠলে বাঘের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক এক আলোচনায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—বিশ্ব ঐতিহ্যের এই অরণ্যে নোনাজলের কুমিরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম।
বনদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে কুমিরের সংখ্যা মাত্র ২৫০-এর কাছাকাছি। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের মতো কুমিরও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখনই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে নেচার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটির উদ্যোগে কলকাতায় একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বনমন্ত্রী, বনদপ্তরের শীর্ষ আধিকারিক এবং বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা।
আলোচনার সময় বনমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ধারণা ছিল সুন্দরবনের নোনা জলে হাজার হাজার কুমির বিচরণ করে। কিন্তু বনদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য দেখে তিনি বিস্মিত হন। সরকারি হিসাবে বর্তমানে কুমিরের সংখ্যা মাত্র আড়াইশোর কাছাকাছি।
মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের পরিচয় শুধু বাঘের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের জলজ বাস্তুতন্ত্রে কুমিরেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই এত কম সংখ্যক কুমিরের উপস্থিতি উদ্বেগের বিষয়।
সম্প্রতি বনমন্ত্রী সুন্দরবন সফর করেছিলেন। সফরের আগে তাঁর ধারণা ছিল অন্তত দুই হাজারের মতো নোনাজলের কুমির সেখানে রয়েছে। কিন্তু বনদপ্তরের পরিসংখ্যান সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়।
সভায় তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি সত্যিই একসময় কুমিরের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে থাকে, তাহলে এত কমে গেল কীভাবে? প্রাকৃতিক কারণ, বাসস্থান সংকুচিত হওয়া, খাদ্যের সংকট, নাকি অন্য কোনো মানবসৃষ্ট সমস্যা—সব দিক খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
সুন্দরবনের পরিবেশ শুধু বাঘের উপর নির্ভরশীল নয়। নোনাজলের কুমির এই জলাভূমির অন্যতম শীর্ষ শিকারি। তারা নদী ও খাঁড়ির খাদ্যশৃঙ্খলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কুমিরের উপস্থিতি নদী ও খাঁড়ির জীববৈচিত্র্যকে ভারসাম্যে রাখে। অসুস্থ ও দুর্বল মাছ কিংবা অন্যান্য প্রাণী শিকার করার মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। এর ফলে পুরো জলজ পরিবেশ সুস্থ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বাস্তুতন্ত্রে শীর্ষ শিকারির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের উপরও পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা সুন্দরবনে আসেন মূলত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখার আশায়। তবে কুমিরও এই অরণ্যের অন্যতম আকর্ষণ।
বন্যপ্রাণ ফটোগ্রাফাররা প্রায়ই নদীর ধারে রোদ পোহানো বিশাল নোনাজলের কুমিরের ছবি তুলতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কুমিরের উপস্থিতি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তাই কুমিরের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু পরিবেশগত উদ্বেগ নয়, ভবিষ্যতের ইকো-ট্যুরিজমের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাঘের সংখ্যা নির্ধারণে বর্তমানে অত্যাধুনিক ট্র্যাপ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে সহজেই বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
কিন্তু কুমিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক জটিল।
বনকর্মীদের ছোট নৌকায় করে গভীর খাঁড়িতে প্রবেশ করতে হয়। সেখানে কুমিরের অবস্থান শনাক্ত করা, পানির উপর ভেসে থাকা মাথা গণনা করা এবং দেহের চিহ্ন বিশ্লেষণ করে আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি শতভাগ নির্ভুল তথ্য পাওয়াও কঠিন। কারণ অধিকাংশ সময় কুমির পানির নিচে অবস্থান করে। ফলে বাস্তবে সরকারি হিসাবের চেয়ে কিছুটা বেশি কুমির থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে সংখ্যাটি সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই, এ বিষয়ে সবাই একমত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
প্রথমত, নদী ও খাঁড়ির প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে কুমিরের নিরাপদ আবাসস্থল কমে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততার মাত্রা ও নদীর প্রবাহে পরিবর্তন আসছে, যা কুমিরের প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, নৌযান চলাচল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙনের প্রভাবও কুমিরের বাসস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে পরিবেশবিদদের ধারণা।
প্রাক্তন বনকর্তা প্রদীপ ব্যাস সুন্দরবনে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁর মতে, কুমির সংরক্ষণে আরও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
তিনি অস্ট্রেলিয়ার নোনাজলের কুমির সংরক্ষণ মডেলের উদাহরণ তুলে ধরে সুন্দরবনের পশ্চিম অংশকে পৃথক “ক্রোকোডাইল রিজার্ভ” হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
এই ধরনের সংরক্ষিত অঞ্চল গড়ে উঠলে কুমিরের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি হবে এবং তাদের প্রজননও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করলেই হবে না। প্রয়োজনে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রও গড়ে তুলতে হবে।
এই ধরনের কেন্দ্র থেকে ছোট কুমির বড় করে নিরাপদ পরিবেশে ছেড়ে দিলে ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি সফল হয়েছে। তাই সুন্দরবনেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইতিবাচক ফল মিলতে পারে।
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর রাজেন্দ্র জাখার জানিয়েছেন, আগের তুলনায় কুমিরের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।
তিনি বলেন, বাঘ সংরক্ষণের মতোই কুমির সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উন্নত গণনা পদ্ধতির মাধ্যমে কুমিরের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
একই সঙ্গে কুমিরের নিরাপদ প্রজনন ও বাসস্থান রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবনের নাম উচ্চারণ করলেই অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথমে আসে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের কথা। কিন্তু একটি সুস্থ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র কেবল একটি প্রাণীর উপর নির্ভর করে না।
কুমির, মাছ, কাঁকড়া, হরিণ, পাখি, সরীসৃপ এবং অসংখ্য অণুজীব মিলেই এই অনন্য জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। তাই শুধু বাঘ রক্ষা করলেই সুন্দরবন রক্ষা হবে না। কুমিরসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে যদি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র এবং কঠোর সংরক্ষণ নীতি কার্যকর করা যায়, তাহলে সুন্দরবনের নোনাজলের কুমিরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন শুধু বাঘের জন্য নয়, নোনাজলের কুমিরের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। অথচ বর্তমানে সেখানে কুমিরের সংখ্যা মাত্র আড়াইশোর আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকা পরিবেশবিদদের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ।
বনমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ—সবাই একমত যে এখনই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই প্রজাতি আরও সংকটে পড়তে পারে। তাই নিয়মিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, উন্নত সংরক্ষণ পরিকল্পনা, প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুন্দরবনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলজ শিকারিকে রক্ষা করাই সময়ের দাবি।

