খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeজাতীয়জিপিএ-৫ রক্ষায় এসএসসি ফরম পূরণে বাধা, ঝরে পড়ল লাখো শিক্ষার্থী

জিপিএ-৫ রক্ষায় এসএসসি ফরম পূরণে বাধা, ঝরে পড়ল লাখো শিক্ষার্থী

২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ফরম পূরণ করে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা-জীবন থেকে ঝরে পড়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেনি। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা থাকলেও বড় একটি অংশকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের কারণে পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরও এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত জিপিএ বা বেশি নম্বর না পাওয়ায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের মূল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রেখেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল ও জিপিএ-৫-এর হার ভালো দেখানোর প্রতিযোগিতাই এমন সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ফরম পূরণ করে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন।

অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যায়। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে আরও প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার শিক্ষার্থী একইভাবে পরীক্ষার বাইরে রয়েছে।

এই বিপুল ব্যবধান শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীরা কোথায় গেল?

শিক্ষা বোর্ডগুলো এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষা মূলত শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য নেওয়া হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল, কোথায় আরও প্রস্তুতি প্রয়োজন এবং পাবলিক পরীক্ষার জন্য সে কতটা প্রস্তুত তা বোঝার সুযোগ থাকে।

আরও পড়ুন :  প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চাইলেন জামায়াত এমপির সাবেক চালক

কিন্তু টেস্ট পরীক্ষায় পাস করার পরও শুধু কম জিপিএ পাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ থেকে বিরত রাখার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর পেলেও অন্যান্য বিষয়ে ভালো ফল করেছে। এরপরও তাকে এসএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের ফলাফল ভালো দেখানোর জন্য ইচ্ছেমতো জিপিএর শর্ত তৈরি করতে পারে না। কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু এ-প্লাস না পাওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার এখতিয়ার প্রতিষ্ঠানের নেই।

তবে টেস্ট পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া কিংবা বোর্ডের নির্ধারিত অন্য কোনো বাধ্যতামূলক যোগ্যতা পূরণ না করার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার করতে পরীক্ষার ফলাফলকে বড় মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। একটি স্কুলে কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, পাশের হার কত এবং কতজন শিক্ষার্থী ভালো কলেজে ভর্তি হয়েছে এসব তথ্যের ওপর অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সুনাম নির্ভর করে।

ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ভালো ফলের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি সুনাম। আর সুনাম বাড়লে নতুন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বাড়ে। এই প্রতিযোগিতার চাপেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষার বাইরে রাখার পথ বেছে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবণতা শুধু একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু জিপিএ-৫ বা পাশের হার দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। নবম শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি বা নিবন্ধিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, কতজন পাস করেছে এবং কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাহলেই একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পাশের প্রকৃত চিত্র অভিভাবকদের সামনে পরিষ্কার হবে।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে নতুন বিতর্ক! আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারিকে কি এবার সরিয়ে দেবে ফিফা?

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কয়েকটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬১৬ জন। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ ২৩৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ২ হাজার ১৩৪ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ হাজার ৭২ জন। ফলে ৭০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে থেকে যায়।

মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ৩ হাজার ৪৯০ জন। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩ হাজার ৩৫৯ জন। অর্থাৎ ১৩১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেনি।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে নিবন্ধিত ২ হাজার ৭৭০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৭২২ জন ফরম পূরণ করে।

এসব তথ্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এত শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে কোথায় গেল এবং কেন তারা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারল না?

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। অভিযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এবার শতভাগ পাশ করা ৬৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময় করার উদ্যোগ নিয়েছে বোর্ড। এসব প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল, ফরম পূরণের তথ্য এবং এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হিসাব যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবার একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছেও কারণ জানতে চাওয়া হবে।

আরও পড়ুন :  স্টিয়ারিং হাতে ঢাকা উত্তর সিটি খুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী

শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হবে, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার কারণ কী। কোনো শিক্ষার্থী অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেছে কি না, পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে কি না কিংবা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

গত বছর শতভাগ পাশ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি। সেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু পাশের হার বা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দেখানো হলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।

ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে ৫০০ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিল ৩০০ জন এবং সবাই পাস করল। তাহলে প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ পাশ করেছে এমন তথ্য দেওয়া technically সঠিক হলেও বাকি ২০০ শিক্ষার্থীর কী হয়েছে, সেই প্রশ্নটি থেকে যায়।

তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল মূল্যায়নে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, ফরম পূরণকারী, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী, উত্তীর্ণ এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

এসএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। শুধু প্রতিষ্ঠানের সুনাম বা জিপিএ-৫-এর হার ধরে রাখার জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো টেস্ট পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করতে পারবে না। বরং ভুল থেকে শেখা, দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাই এসএসসি ফরম পূরণে কোনো ধরনের অনিয়ম, জিপিএ-ভিত্তিক অযৌক্তিক বাছাই কিংবা শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার বাইরে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ