খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলনিউ মার্কেটের ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ড, ২৪ ঘণ্টা পর শনাক্ত বাকি দুই বাংলাদেশি

নিউ মার্কেটের ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ড, ২৪ ঘণ্টা পর শনাক্ত বাকি দুই বাংলাদেশি

আলিমুজ্জামানের এক আত্মীয় জানিয়েছেন, চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। পরে পরিবারের কাছ থেকে খবর পেয়ে খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, তিনি মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলেই ছিলেন।

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত বাকি দু’জনেরও পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁদের শনাক্ত করা হয়। জানা গেছে, মৃত দু’জনও বাংলাদেশের নাগরিক। এর ফলে এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে পাঁচতলা একটি ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে প্রাণ হারান বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বুধবার সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছিল। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার শনাক্ত করা হয় আরও দু’জনকে।

বৃহস্পতিবার শনাক্ত হওয়া দু’জন হলেন এসএম আলিমুজ্জামান, বয়স ৪৫ বছর, এবং রেবতী সরকার। দু’জনই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।

হোটেলের নথি, পাসপোর্ট এবং বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাছে থাকা তথ্য মিলিয়ে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। শনাক্তের পর তাঁদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

আলিমুজ্জামানের এক আত্মীয় জানিয়েছেন, চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। পরে পরিবারের কাছ থেকে খবর পেয়ে খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, তিনি মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলেই ছিলেন।

আলিমুজ্জামান পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ওই আত্মীয়ের কথায়, এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর কারও সঙ্গে না ঘটে।

‘শিখা ইন’-এর অগ্নিকাণ্ডে মৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই পরিবারের চারজনও রয়েছেন। তাঁরা হলেন ৭৪ বছর বয়সি আক্রম আলি, ৩৯ বছর বয়সি সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, ২৭ বছর বয়সি আফসানা শারমীন এবং মাত্র ২ বছর ৮ মাস বয়সি শিশু স্বর্ণশীষ দত্ত।

চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁরা ভারতে এসেছিলেন বলে জানা গেছে। একই পরিবারের কয়েকজনের একসঙ্গে মৃত্যু ঘটনায় পরিস্থিতি আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া বাবু আহমেদ নামে ৩৭ বছর বয়সি আরও এক বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকারের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় সাতজনে।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই অধিকাংশ মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হোটেলের বিভিন্ন ঘরের বিছানা, মেঝে এবং শৌচালয় থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।

এই ঘটনায় দুই ভারতীয় নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের একজন শিলিগুড়ির বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সি যোগ নারায়ণ অগ্রবাল। অন্যজন ঝাড়খণ্ডের গিরিডির বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সি সন্দীপ পাসোয়ান।

সন্দীপ কলকাতায় জীবনের প্রথম চাকরি করতে এসেছিলেন। তিনি ‘শিখা ইন’ হোটেলের রিসেপশনে কাজ করতেন। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, রিসেপশন এলাকাতেই শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হোটেলের ভেতরে থাকা অতিথিরা বের হওয়ার সুযোগ খুব কম পেয়েছিলেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ধোঁয়ায় পুরো হোটেল ভরে যায়।

অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ ও ফরেনসিক সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১১০০ বর্গফুট জায়গার মধ্যে হোটেলটিতে পাঁচটি ঘর তৈরি করা হয়েছিল।

প্রতিটি ঘরের সঙ্গে ছিল আলাদা স্নানঘর। একই জায়গার মধ্যে ছিল রিসেপশন এবং যাতায়াতের জন্য খুবই সংকীর্ণ পথ। ফলে আগুন লাগার পর দ্রুত বেরিয়ে আসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না।

অভিযোগ উঠেছে, জায়গা বাঁচানোর জন্য ঘরগুলিতে স্লাইডিং দরজা ব্যবহার করা হয়েছিল। তার ওপর সব ঘরের উপরে ছিল কাঠের তৈরি একটি টানা ফলস সিলিং। আগুনের ধোঁয়া ওই সিলিংয়ের ফাঁক দিয়ে দ্রুত এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান।

এ কারণেই কয়েক মিনিটের মধ্যে হোটেলের বিভিন্ন অংশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলে মোট ১০ জন আবাসিক ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’জন প্রাণে বেঁচেছেন।

আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে তাঁরা জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে হোটেলের কার্নিসে আশ্রয় নেন। দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করার পর দমকলকর্মীরা তাঁদের উদ্ধার করেন।

এই ঘটনায় হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, হোটেলের ভেতরে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। আগুন লাগার পর অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার মতো কার্যকর ব্যবস্থাও দেখা যায়নি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, অগ্নিনিরাপত্তার এমন ঘাটতি কীভাবে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে গেল।

কারণ, মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ওই ভবন থেকে কলকাতা দমকল বিভাগের সদর দফতরের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কলকাতা পুরসভাও প্রায় ৯৫০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত।

এত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও একটি হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে হোটেলটির অনুমোদন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে দমকল বিভাগ। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের নয়টি গেস্ট হাউস এবং চারটি রেস্তরাঁকে ইতিমধ্যে শোকজ করা হয়েছে।

দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

নিউ মার্কেটের ঘিঞ্জি এলাকায় হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে এই দুর্ঘটনা নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে অল্প জায়গায় অতিরিক্ত কক্ষ তৈরি, পর্যাপ্ত বের হওয়ার পথ না থাকা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়া এবং দাহ্য উপকরণের ব্যবহার—সবকিছু নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

‘শিখা ইন’-এর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শুধু নয়জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, একই সঙ্গে শহরের হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড়সড় ফাঁকও সামনে এনেছে। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ায় ঘটনাটি বাংলাদেশেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ