খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলকলকাতা হোটেল অগ্নিকাণ্ড: ফল্‌স সিলিংয়ের ফাঁকে ছড়াল ধোঁয়া, ঘরেই মৃত্যু ৮ জনের

কলকাতা হোটেল অগ্নিকাণ্ড: ফল্‌স সিলিংয়ের ফাঁকে ছড়াল ধোঁয়া, ঘরেই মৃত্যু ৮ জনের

ফরেন্সিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখতে পায়, ঘরগুলির দেওয়াল ছাদ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে তোলা হয়নি। বরং ফল্‌স সিলিং পর্যন্ত দেওয়াল তুলে ঘর আলাদা করা হয়েছিল। ফলে সিলিংয়ের উপরের অংশে একটি ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সামনে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ফরেন্সিক দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ছিল। ছোট জায়গার মধ্যে একাধিক ঘর তৈরি করা হলেও সেগুলির বেশিরভাগে কোনও জানলা ছিল না। ঘরগুলির উপরের অংশে কাঠের ফল্‌স সিলিং থাকায় আগুনের ধোঁয়া খুব দ্রুত এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, হোটেল থেকে বেরোনোর জন্য কার্যত একটি মাত্র দরজা ছিল। আর সেই দরজার পাশেই ছিল রিসেপশন। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান সত্যি হলে, আগুনের সূত্রপাতও হয়েছিল ওই রিসেপশনেই। ফলে আগুন লাগার পর আবাসিকদের সামনে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার কার্যকর কোনও পথ ছিল না।

মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলটি আয়তনে খুব বড় ছিল না। প্রায় ১১০০ বর্গফুট জায়গার মধ্যে পাঁচটি ঘর তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি ঘরের সঙ্গে ছিল আলাদা স্নানঘর।

কিন্তু ঘরগুলির নির্মাণ পদ্ধতিই এখন তদন্তকারীদের বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে। পাঁচটি ঘরের মধ্যে চারটির কোনও জানলা ছিল না। ফলে আগুন বা ধোঁয়া ঢুকে পড়ার পর আবাসিকদের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার বিকল্প পথ কার্যত ছিল না।

ফরেন্সিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখতে পায়, ঘরগুলির দেওয়াল ছাদ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে তোলা হয়নি। বরং ফল্‌স সিলিং পর্যন্ত দেওয়াল তুলে ঘর আলাদা করা হয়েছিল। ফলে সিলিংয়ের উপরের অংশে একটি ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।

এই কাঠামোই অগ্নিকাণ্ডের সময় ভয়াবহ বিপদ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফরেন্সিক দলের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে ২টোর মধ্যে হোটেলের রিসেপশনে শর্ট সার্কিটের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

রিসেপশন ছিল অত্যন্ত ছোট। সেখানে একটি টেবিল, একটি সোফা এবং দেওয়ালে টেলিভিশন ছিল। রিসেপশনের সঙ্গে হোটেলের ঘরগুলিতে যাওয়ার জন্য ছিল সরু পথ।

আগুন রিসেপশনে শুরু হলে প্রথমে সেখানে ধোঁয়া জমতে থাকে। কিন্তু ঘরগুলির উপরে থাকা একটানা ফল্‌স সিলিংয়ের কারণে সেই ধোঁয়া আটকে থাকেনি। বরং সিলিংয়ের ফাঁকা অংশ দিয়ে দ্রুত বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কারণেই অনেক আবাসিক আগুনের শিখা সরাসরি তাঁদের ঘরে পৌঁছানোর আগেই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়েন।

ফল্‌স সিলিংটি কাঠের তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে থাকতে পারে। একই সিলিংয়ের কাঠামোর মধ্যে প্রতিটি ঘরের এলইডি আলো লাগানো ছিল। সেখানেও কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় সেই ফাঁকা অংশ দিয়েই ধোঁয়া দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে।

ধোঁয়া ঢুকে যাওয়ার পর সেটি বের করে দেওয়ার মতো কোনও কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।

হোটেলের ঘরগুলির আয়তন এতটাই ছোট ছিল যে সেখানে প্রচলিত দরজা বসানোর জায়গাও ছিল না। তাই ঘরগুলিতে স্লাইডিং দরজা ব্যবহার করা হয়েছিল।

তদন্তকারীদের ধারণা, স্লাইডিং দরজার ফাঁক দিয়েও ধোঁয়া ঘরে প্রবেশ করে থাকতে পারে। অর্থাৎ ঘরের ভিতরে থাকা মানুষদের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসা যেমন কঠিন ছিল, তেমনই ঘরের ভিতরে ধোঁয়া ঢোকা ঠেকানোরও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।

ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরগুলি ধোঁয়ায় ভরে যায়।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ‘শিখা ইন’-এর পাঁচটি ঘরে মোট ১০ জন আবাসিক ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়।

ফরেন্সিক দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ আবাসিক আগুনে পুড়ে নয়, বরং ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন।

কেউ বিছানার উপরে পড়ে ছিলেন। কারও দেহ পাওয়া যায় ঘরের মেঝেতে। আবার কোনও কোনও ঘরের শৌচালয় থেকেও উদ্ধার হয়েছে নিথর দেহ।

এই দৃশ্যই বোঝাচ্ছে, শেষ মুহূর্তে বাঁচার জন্য আবাসিকেরা ঘরের ভিতরেই বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ধোঁয়ার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাঁদের কেউই বেরিয়ে আসতে পারেননি।

এই ভয়াবহ ঘটনার মধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে সেই ঘরে, যেখানে জানলা ছিল।

জানলা থাকা ঘরে থাকা এক দম্পতি কোনওভাবে সেখান দিয়ে বেরিয়ে হোটেলের কার্নিসে পৌঁছতে সক্ষম হন। তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা তাঁরা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নিচে থাকা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য মোবাইলের আলো ব্যবহার করেন তাঁরা। অন্ধকারের মধ্যে মোবাইলের আলো নিচে ফেলে সাহায্যের সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেন।

পরে দমকলকর্মীরা মই ব্যবহার করে তাঁদের উদ্ধার করেন।

এই ঘটনাটিই আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে একটি জানলা বা বিকল্প বেরোনোর পথ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডে শুধু আবাসিকেরাই নন, হোটেলের এক কর্মীরও মৃত্যু হয়েছে।

জানা গিয়েছে, গিরিডি থেকে জীবনের প্রথম চাকরির জন্য কলকাতায় এসেছিলেন ওই যুবক। হোটেলের রিসেপশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

ফরেন্সিক দলের প্রাথমিক অনুমান যদি সঠিক হয় এবং আগুন সত্যিই রিসেপশনের শর্ট সার্কিট থেকে শুরু হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলের অবস্থান এবং ওই কর্মীর দায়িত্ব— দুটিই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল হোটেলের প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা।

‘শিখা ইন’-এ প্রবেশ এবং বেরোনোর জন্য একটি মাত্র দরজা ছিল। সেই দরজার লাগোয়া ছিল রিসেপশন। রিসেপশন থেকে ঘরগুলির দিকে যাওয়ার পথও ছিল অত্যন্ত সরু।

ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও আবাসিক আগুন লাগার পর ঘর থেকে বেরিয়েও যদি রিসেপশনের দিকে আসতেন, তাঁর নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম ছিল। কারণ আগুনের সূত্রপাত যদি সত্যিই রিসেপশনে হয়ে থাকে, তাহলে বেরোনোর একমাত্র পথের কাছেই আগুন জ্বলছিল।

অর্থাৎ আবাসিকদের সামনে কার্যত দুটি বিপদ ছিল। ঘরের ভিতরে থাকলে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, আর বাইরে বেরোতে চাইলে আগুনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি।

অগ্নিকাণ্ডের পর ফরেন্সিক আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন ধরনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে টেলিভিশন, পুড়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তার এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য সামগ্রী।

আগুনের সঠিক উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব নমুনা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগেছিল কি না, নাকি অন্য কোনও কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল— ফরেন্সিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা হোটেলের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়ম দেখতে পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

ছোট জায়গায় একাধিক ঘর তৈরি করা, অধিকাংশ ঘরে জানলা না থাকা, ছাদ পর্যন্ত সম্পূর্ণ দেওয়াল না থাকা, কাঠের ফল্‌স সিলিং এবং একমাত্র প্রবেশ-প্রস্থান দরজা— সব মিলিয়ে ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এতদিন ধরে এমন একটি স্থানে কীভাবে হোটেল ব্যবসা চলল?

নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল কি না এবং ভবনটি আদৌ আবাসিক হোটেল হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল কি না— তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট দুটি ভবন সিল করে দিয়েছে দমকল বিভাগ। এর ফলে ওই ভবনগুলিতে আপাতত স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত ভবনগুলির নিরাপত্তা এবং অনুমোদনের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ডিসির নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা আগুনের উৎস, ভবনের কাঠামো, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হোটেল পরিচালনার অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করবেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এই ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট চেয়েছেন। তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের পর ‘শিখা ইন’-এর পরিস্থিতি দেখে স্থানীয়দের অনেকেই একে কার্যত ‘জতুগৃহ’ বলে বর্ণনা করছেন। কারণ আগুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল ধোঁয়া এবং বেরোনোর পথের অভাব।

একটি ছোট ভবনের মধ্যে একাধিক মানুষকে থাকার ব্যবস্থা করা হলেও জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপদে বের করে আনার কোনও কার্যকর পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

একটি অগ্নিকাণ্ড কখনও শুধু আগুনের কারণে প্রাণঘাতী হয় না। ধোঁয়া, বন্ধ দরজা, জানলাহীন ঘর, সরু সিঁড়ি এবং বিকল্প বেরোনোর পথ না থাকা— সবকিছু মিলেই একটি ভবনকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে।

‘শিখা ইন’-এর ঘটনায় সেই আশঙ্কাই ভয়াবহ বাস্তব রূপ নিয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে শুধু আগুনের উৎস নয়, কীভাবে এতগুলি নিরাপত্তা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও হোটেলটি চলছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ দায় নির্ধারণ না হলে এবং নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না হলে কলকাতার অন্য কোনও হোটেলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে।


Discover more from News Bangla24x7

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Table of contents [hide]

আর্কাইভ