বিশ্বকাপে ব্রাজিলের নতুন লড়াই: আনচেলত্তির অধীনে হারানো পরিচয় ফিরে পাওয়ার মিশন
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিলের নাম উচ্চারণ হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গৌরবময় অতীত। কিন্তু অবাক করার মতো সত্য হলো, প্রায় এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে বিশ্বকাপের ট্রফি ছুঁতে পারেনি সেলেসাওরা। ২০০২ সালে রোনালদোর জোড়া গোলে জার্মানিকে হারিয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ব্রাজিল যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ কার্লো আনচেলত্তির নেতৃত্বে নতুন যাত্রা শুরু করছে ব্রাজিল। তবে এই যাত্রা শুধু শিরোপা জয়ের নয়, বরং নিজেদের হারানো পরিচয় পুনরুদ্ধারেরও।
বিশ্বকাপের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিল মানেই সৌন্দর্য, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ঐতিহ্য যেন ম্লান হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। কনমেবল অঞ্চলের ছয়টি সরাসরি টিকিটের মধ্যে তারা পঞ্চম স্থান অর্জন করে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে। ১৮ ম্যাচে ছয়টি পরাজয়, যার মধ্যে প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ার বিপক্ষেও হার ছিল, দলটির অস্থিরতারই প্রতিফলন।
আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ের পিছনে থেকে বিশ্বকাপে আসা ব্রাজিলের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
২০২৫ সালের মে মাসে ব্রাজিল দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল এই কোচের ওপর প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি অধিনায়ক কাফু মনে করেন, আনচেলত্তি দলের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিরতা ও নেতৃত্ব নিয়ে এসেছেন। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, ব্রাজিলকে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সৃজনশীল ফুটবলও ফিরিয়ে আনতে হবে।
অর্থাৎ, আনচেলত্তির সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—শুধু জিতলেই হবে না, ব্রাজিলিয়ান ধাঁচেও জিততে হবে।
বর্তমান ব্রাজিল দল সবচেয়ে বেশি ভুগছে পরিচয়ের সংকটে। তারা কি আগের মতো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে, নাকি বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করবে?
বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে মাত্র ২৪ গোল করেছে ব্রাজিল, যা প্রতি ম্যাচে গড়ে দেড় গোলেরও কম। ব্রাজিলের মতো ঐতিহ্যবাহী আক্রমণভিত্তিক দলের জন্য এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক।
যদিও আনচেলত্তি তার দলে নয়জন ফরোয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তবুও বাস্তবতা হলো সফল হতে হলে হয়তো তাকে নিজের স্বভাবসুলভ ভারসাম্যপূর্ণ ও রক্ষণাত্মক কৌশলেই ভরসা করতে হবে।
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো নেইমারকে দলে ফিরিয়ে আনা।
সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি তারকা দীর্ঘ আড়াই বছরের বেশি সময় জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড পুরোপুরি ফিট নন, তবুও তাকে দলে নেওয়া হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি আনচেলত্তির আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত, নাকি ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির চাপের কাছে আত্মসমর্পণ?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নেইমার কি এমন একটি দলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন যেখানে তিনি আর প্রধান তারকা নন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ভাগ্য।
আনচেলত্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো কাসেমিরোকে আবার দলে ফেরানো।
১৮ মাস পর জাতীয় দলে ফিরে আসা সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড মিডফিল্ডারের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মূল্যবান। নিউক্যাসলের ব্রুনো গিমারাইসের সঙ্গে মধ্যমাঠে তার জুটি ব্রাজিলকে বাড়তি স্থিতিশীলতা দিতে পারে।
তবে বয়সের কারণে কাসেমিরোর গতিশীলতা আগের মতো নেই। ফলে তার পাশে থাকা খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে।
ব্রাজিলের বর্তমান দলের সবচেয়ে বড় ভরসা রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
বাম প্রান্ত থেকে তার গতি, ড্রিবলিং এবং গোল তৈরির ক্ষমতা ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র হতে পারে। অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাতেউস কুনহা কেন্দ্রীয় আক্রমণভাগে নিজের জায়গা পাকা করার লড়াইয়ে রয়েছেন।
৪-২-৪ ফরমেশন ব্যবহার করে আনচেলত্তি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতেই তিনি আগ্রহী।
ব্রাজিলের সবচেয়ে শক্তিশালী বিভাগ হতে পারে তাদের রক্ষণভাগ।
আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল এবং পিএসজির মারকিনিওসের সেন্টার-ব্যাক জুটি পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই খেলোয়াড়ের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং নেতৃত্বগুণ ব্রাজিলের রক্ষণকে দৃঢ় ভিত্তি দিতে পারে। বিশ্বকাপে ভালো করতে হলে এই জুটির সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান অর্জন করতে পারলে ব্রাজিল তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেতে পারে নকআউট পর্বে। জাপান, সুইডেন, নরওয়ে বা সেনেগালের মতো দলের বিপক্ষে খেলার সম্ভাবনা থাকবে।
কিন্তু যদি তারা গ্রুপ রানার্সআপ হয়, তাহলে স্পেন বা ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হতে পারে অনেক আগেই।
তাই শুরু থেকেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের অনিশ্চিত পারফরম্যান্স।
একদিন তারা দুর্দান্ত ফুটবল খেলতে পারে, আবার পরের ম্যাচেই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এই অস্থিরতা কখনও কখনও আত্মঘাতী পর্যায়েও পৌঁছে যায়।
আনচেলত্তির মূল কাজ হবে দলকে মানসিকভাবে দৃঢ় করা এবং একটি সুস্পষ্ট খেলার দর্শন প্রতিষ্ঠা করা।
কাগজে-কলমে ব্রাজিলের স্কোয়াড প্রতিভায় ভরপুর। অভিজ্ঞতা, তারুণ্য এবং বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সমন্বয় রয়েছে এই দলে।
কার্লো আনচেলত্তি সম্ভবত এই মুহূর্তে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কোচ। তবে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই খেলোয়াড়দের সমন্বয় কি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যথেষ্ট?
বিশেষ করে, বলের দখল হারানোর পর দলের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, সেটিই হতে পারে তাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল চাবিকাঠি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ব্রাজিল সবসময়ই ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এবার তাদের লড়াই শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের পরিচয় সংকট কাটিয়ে ওঠার বিরুদ্ধেও।
যদি আনচেলত্তি এই দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন এবং হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন, তাহলে হয়তো বিশ্ব ফুটবল আবারও দেখতে পারে সেই চেনা, ভয়ংকর ব্রাজিলকে। আর যদি তা না হয়, তাহলে আরও একটি বিশ্বকাপ শেষ হতে পারে অপূর্ণ স্বপ্ন আর অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্য দিয়ে।

