ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নাটক, উত্তেজনা এবং অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের সমাহার। তবে ভারতীয় সময় রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত যা ঘটল, তা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। মাত্র চারটি ম্যাচে হয়েছে মোট ১৯টি গোল। জার্মানি ও সুইডেন বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে, জাপান দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ড্র করেছে, আর শেষ মুহূর্তের গোলে জয় তুলে নিয়েছে আইভরি কোস্ট।
কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিল জার্মানি
বিশ্বকাপে জার্মানির ৭-১ ব্যবধানে জয় ফুটবলপ্রেমীদের মনে ফিরিয়ে আনল ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালের স্মৃতি, যখন তারা ব্রাজিলকে একই ব্যবধানে হারিয়েছিল। এবার তাদের শিকার কুরাসাও।
ম্যাচের মাত্র ৬ মিনিটেই ফেলিক্স মেচার গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। ফ্লোরিয়ান উইর্ৎজের নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে স্বস্তি এনে দেন তিনি। তবে ২১ মিনিটে লিভানো কমেনেন্সিয়ার গোলে সমতা ফেরায় কুরাসাও। বিশ্বকাপে এটি ছিল কুরাসাওয়ের ইতিহাসের প্রথম গোল।
এই গোল যেন জার্মানিকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে। এরপর পুরো ম্যাচে বলের দখল, আক্রমণের তীব্রতা এবং গোলের সুযোগ তৈরিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সাতটি গোলের মধ্যে ছয়জন ভিন্ন ফুটবলার স্কোরশিটে নাম লেখান, যা জার্মানির দলগত শক্তিরই প্রমাণ।
কুরাসাওয়ের হারেও গর্বের গল্প
মাত্র এক লাখ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সাত গোল হজম করলেও তারা কখনও নেতিবাচক ফুটবল খেলেনি।
প্রতি সুযোগে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে দলটি। রক্ষণাত্মক মানসিকতায় গুটিয়ে না থেকে পাসিং ফুটবল খেলার সাহস দেখিয়েছে। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় পিছিয়ে থাকলেও তাদের লড়াকু মানসিকতা ফুটবলপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নেদারল্যান্ডসকে রুখে দিল জাপান
নেদারল্যান্ডস ও জাপানের ম্যাচটি ছিল দুই ভিন্ন অর্ধের গল্প। প্রথমার্ধে দুই দলের ফুটবলে ছিল না তেমন কোনো গতি কিংবা আক্রমণাত্মক মানসিকতা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
শুরুর দিকে ডনিয়েল মালেন গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। এরপর দীর্ঘ সময় দুই দলই বল দখলে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। জাপানের গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে আসে জাপানের চেনা রূপ
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ভার্জিল ভ্যান ডাইকের গোলে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। জাপানের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে হেডে গোল করেন ডাচ অধিনায়ক।
তবে সাত মিনিট পরেই সমতায় ফেরে জাপান। তাকেফুসা কুবোর দারুণ আক্রমণ থেকে সুযোগ পেয়ে কিতো নাকামুরা গোল করেন। এরপর আবারও এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। ক্রিসেন্সিয়ো সামারভিল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অসাধারণ গোল করে দলকে এগিয়ে দেন।
মনে হচ্ছিল তিন পয়েন্ট নিয়েই মাঠ ছাড়বে ডাচরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোকি ওগাওয়ার শট দাইচি কামাদার গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। ফলে ২-২ গোলের নাটকীয় ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে দুই দল।
জাপানের লড়াইয়ের মানসিকতা
তাকুমি মিনামিনো এবং কাওরু মিতোমার মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতে জাপান কিছুটা দুর্বল ছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে তাদের আগ্রাসী ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে, বড় দলের বিপক্ষে লড়াই করতে তারা কতটা প্রস্তুত।
সুইডেনের ৫ গোল, বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ হওয়ার ইঙ্গিত
টিউনিশিয়ার বিপক্ষে ৫-১ গোলের দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়ে নিজেদের শক্তির বার্তা দিয়েছে সুইডেন। দলটির পারফরম্যান্স দেখে অনেকেই তাদের এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে ইয়াসিন আইয়ারি গোল করে সুইডেনকে এগিয়ে দেন। টিউনিশিয়ান বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার প্রতিপক্ষ দেশের বিপক্ষে গোল করলেও উদযাপন করেননি।
৩০ মিনিটে আলেকজান্ডার ইসাক অসাধারণ ব্যক্তিগত দক্ষতায় ব্যবধান বাড়ান। বিরতির ঠিক আগে ওমার রেকিক একটি গোল শোধ করে টিউনিশিয়াকে আশা দেখান।
দ্বিতীয়ার্ধে সুইডেনের একচ্ছত্র আধিপত্য
বিরতির পর পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় সুইডেন। ভিক্টর গয়কেরেস দলের তৃতীয় গোল করেন। বদলি হিসেবে নেমেই প্রথম স্পর্শে গোল করেন ম্যাটিয়াস সোয়ানবার্গ।
সংযুক্তি সময়ে দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন ইয়াসিন আইয়ারি। এই জয়ের ফলে গ্রুপের শীর্ষে উঠে এসেছে সুইডেন।
জাপান ও নেদারল্যান্ডসের ড্রয়ের পর সুইডেনের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তাদের আক্রমণভাগের ধার এবং সংগঠিত দলগত ফুটবল প্রতিপক্ষদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ মুহূর্তের গোলে আইভরি কোস্টের জয়
দিনের সবচেয়ে কম গোলের ম্যাচ ছিল আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডরের লড়াই। যখন সবাই ধরে নিয়েছিল ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হবে, তখনই নাটকীয় মুহূর্তের জন্ম দেন আমাদ দিয়ালো।
নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে আইভরি কোস্টকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন তিনি। লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিদের বিপক্ষে এই জয় আফ্রিকান দলটির জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর বড় উপলক্ষ হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপে গোলবন্যার দিনে ফুটবলপ্রেমীদের প্রাপ্তি
এক দিনে চার ম্যাচে ১৯ গোল— বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন গোলবন্যা খুব কমই দেখা যায়। জার্মানির বিধ্বংসী আক্রমণ, সুইডেনের আত্মবিশ্বাসী ফুটবল, জাপানের লড়াকু প্রত্যাবর্তন এবং আইভরি কোস্টের শেষ মুহূর্তের জয় ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে অসাধারণ এক রাত।
এই ম্যাচগুলো আরও একবার প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপে কোনো দলকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বড় দলগুলোর শক্তির পাশাপাশি ছোট দলগুলোর সাহস ও লড়াইয়ের মানসিকতাও এই টুর্নামেন্টকে করে তোলে অনন্য।
বিশ্বকাপের প্রতিটি দিনই নতুন গল্পের জন্ম দেয়। আর এই ১৯ গোলের দিনটি নিঃসন্দেহে ফুটবল ইতিহাসের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

