বিদেশ ভ্রমণ মানেই নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন খাবার এবং নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানি। তবে সুন্দর একটি ভ্রমণ মুহূর্তের মধ্যেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে, যদি আপনি গন্তব্য দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন। অনেক পর্যটকই মনে করেন, নিজের দেশে যে কাজ স্বাভাবিক, অন্য দেশেও সেটি একইভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশ্বের অনেক দেশে এমন কিছু আইন রয়েছে, যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অস্বাভাবিক বা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। অথচ এসব আইন ভঙ্গ করলে শুধু জরিমানাই নয়, কখনও কখনও কারাদণ্ড কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তিও হতে পারে।
প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক স্থানীয় আইন সম্পর্কে না জানার কারণে বিমানবন্দরেই আটকে যান, মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয় কিংবা আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু দর্শনীয় স্থান কিংবা আবহাওয়ার খবর জানলেই হবে না, বরং সেই দেশের আইন, সামাজিক রীতি এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কেও ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু থাইল্যান্ডে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।
দেশটিতে রাজা, রানি কিংবা রাজপরিবারকে অবমাননা করা অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। শুধু প্রকাশ্য সভা বা বক্তব্য নয়, ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, টুইট, মন্তব্য কিংবা কোনো ধরনের অনলাইন কনটেন্টও এই আইনের আওতায় পড়ে।
অনেক বিদেশি পর্যটক সামাজিক মাধ্যমে অসতর্ক মন্তব্য করার কারণে আইনি জটিলতায় পড়েছেন। তাই থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে রাজপরিবার সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য বা ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
বর্তমান সময়ে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছবি ও ভিডিও ধারণ করা। অনেকেই রাস্তা, শপিংমল বা সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়ে আশপাশের মানুষকে ফ্রেমে রেখে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাইয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার আইন অত্যন্ত কঠোর।
কারও অনুমতি ছাড়া তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা, কিংবা সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। এমন অপরাধের জন্য বড় অঙ্কের জরিমানা, আটক কিংবা কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
তাই দুবাইয়ে ছবি তোলার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে অন্য কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে ছবিতে আসছে না অথবা প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম। এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে দেশটি অত্যন্ত কঠোর আইন প্রয়োগ করে।
রাস্তায় আবর্জনা ফেলা, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ছুড়ে দেওয়া, দেয়ালে আঁকিবুঁকি করা কিংবা সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করলে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতে পারে।
গুরুতর ভাঙচুরের ঘটনায় আদালত কারাদণ্ডের পাশাপাশি বেত্রাঘাতের মতো শাস্তিও দিতে পারে।
অনেকের ধারণা, সিঙ্গাপুরে চুইংগাম চিবানো নিষিদ্ধ। বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। সেখানে চুইংগাম খাওয়া অপরাধ নয়, তবে চুইংগামের বিক্রি ও আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাই ভুল তথ্যের বদলে প্রকৃত নিয়ম জেনে ভ্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহৃত অনেক প্রেসক্রিপশনের ওষুধ জাপানে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ তালিকায় থাকতে পারে।
অনেকে না জেনে নিজের ওষুধ সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তারা সেগুলো জব্দ করেন।
বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ, ব্যথানাশক কিংবা কিছু সর্দি-কাশির ওষুধের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
তাই জাপানে যাওয়ার আগে সঙ্গে নেওয়া প্রতিটি ওষুধ দেশটির আইনে অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ও প্রয়োজনীয় নথিও সঙ্গে রাখা ভালো।
শ্রীলঙ্কা একটি বৌদ্ধপ্রধান দেশ। সেখানে ধর্মীয় প্রতীক ও উপাসনালয়ের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন সামাজিক এবং আইনি—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
বুদ্ধমূর্তির দিকে পিঠ দিয়ে ছবি তোলা, মূর্তিকে স্পর্শ করা বা অসম্মানজনক ভঙ্গিতে ছবি তোলা অনেক সময় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অতীতে এমন ঘটনার কারণে বিদেশি পর্যটকদের আটক করা হয়েছে এবং দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটেছে।
ধর্মীয় স্থান ভ্রমণের সময় স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা এবং শালীন আচরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ইন্দোনেশিয়া, বিশেষ করে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বালি, প্রতিবছর লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। তবে দেশটির মাদকবিরোধী আইন বিশ্বের অন্যতম কঠোর।
অল্প পরিমাণ মাদক বহন করলেও তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরাধের ধরন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও রয়েছে।
অনেক সময় অপরিচিত কারও কাছ থেকে কোনো ব্যাগ বা প্যাকেট বহন করতে গিয়েও মানুষ বিপদে পড়েন। তাই নিজের লাগেজ সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপরিচিত কারও জিনিস বহন না করাই নিরাপদ।
অনেক পর্যটক ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে সমুদ্রসৈকতের পাথর, পুরোনো ইট কিংবা প্রত্নস্থল থেকে ছোটখাটো বস্তু সংগ্রহ করেন।
কিন্তু গ্রিস, ইতালি, মিসরসহ বিশ্বের বহু দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা থেকে কোনো বস্তু সরিয়ে নেওয়া বা ঐতিহাসিক নিদর্শনের ক্ষতি করা আইনত দণ্ডনীয়।
এমনকি ছোট একটি পাথরও অনেক সময় সরকারি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তাই কোনো প্রত্নস্থল বা ঐতিহাসিক স্থান থেকে কিছু সংগ্রহ করার আগে স্থানীয় নিয়ম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বর্তমানে অনেক পর্যটক ভ্রমণের সময় ড্রোন ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ করেন। কিন্তু সব দেশে ড্রোন ওড়ানোর অনুমতি নেই।
কিছু দেশে বিমানবন্দর, সামরিক এলাকা, সরকারি ভবন কিংবা পর্যটনস্থলের আশপাশে ড্রোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ালে জরিমানা, ড্রোন জব্দ কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ড্রোন ব্যবহারের নীতিমালা জেনে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু আইন নয়, অনেক দেশে সামাজিক রীতিনীতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোথাও উচ্চস্বরে কথা বলা অপছন্দ করা হয়, কোথাও ধর্মীয় স্থানে নির্দিষ্ট পোশাক বাধ্যতামূলক, আবার কোথাও প্রকাশ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ আচরণ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এসব বিষয় অমান্য করলে কখনও স্থানীয় মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া, আবার কখনও আইনগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন দেশে যাওয়ার আগে তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুটা পড়াশোনা করলে অপ্রয়োজনীয় বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত ভ্রমণের জন্য কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।
প্রথমত, গন্তব্য দেশের সরকারি ভ্রমণ নির্দেশিকা পড়ে নিন।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় আইন, সংস্কৃতি এবং সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে আগেই ধারণা নিন।
তৃতীয়ত, প্রেসক্রিপশনের ওষুধ সঙ্গে নিলে সেগুলো বৈধ কি না তা যাচাই করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন সঙ্গে রাখুন।
চতুর্থত, ড্রোন, পেশাদার ক্যামেরা, স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ সরঞ্জাম বহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমতির প্রয়োজন আছে কি না, তা আগে থেকেই নিশ্চিত করুন।
পঞ্চমত, নিজের পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিট ও গুরুত্বপূর্ণ নথির ডিজিটাল কপি মোবাইল ও ক্লাউডে সংরক্ষণ করুন। এতে কোনো নথি হারিয়ে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
সবশেষে, স্থানীয় জরুরি সেবা নম্বর, বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা এবং যোগাযোগের তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখুন।

