নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা, ২ সেপ্টেম্বর : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান চলে আসছে। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত তীব্র হওয়ার পর এই অবৈধ বাণিজ্যের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের কারণে রাখাইনে খাদ্য, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী ও ওষুধের সংকট বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে যাচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক।
সীমান্তের এই চোরাচালান এখন শুধু নাফ নদী বা টেকনাফকেন্দ্রিক নেই। বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত নৌপথও ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। মাছ ধরার ট্রলার ও ছোট নৌযানকে ব্যবহার করে একদিকে প্রয়োজনীয় পণ্য পাঠানো হচ্ছে, অন্যদিকে বিনিময় হিসেবে মাদক আনার অভিযোগ উঠেছে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এর প্রভাব পড়ে রাখাইন রাজ্যের যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায়। বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট তৈরি হয়।
কেন্দ্রীয় মিয়ানমার থেকে রাখাইনে পণ্য সরবরাহেও নানা বাধা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি এই পরিস্থিতি অবৈধ বাণিজ্যের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রাখাইনে বিভিন্ন পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সীমান্তে অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট, খাদ্যপণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী ও ওষুধ জব্দ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্য রাখাইনে পৌঁছে দেওয়ার পর বিনিময়ে ইয়াবা ও আইসসহ মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে নিয়ে আসে পাচারকারীরা।
অর্থাৎ প্রচলিত নগদ অর্থের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে মাদককেই লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘নার্কো কারেন্সি’ বা মাদকভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থায় পাচারকারীরা একদিকে সীমান্তের ওপারে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করছে, অন্যদিকে দেশে মাদকের বাজারে বড় ধরনের লাভের সুযোগ নিচ্ছে।
সিমেন্ট এখন এই চোরাচালান বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে পরিণত হয়েছে। রাখাইনে নির্মাণ সামগ্রীর সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশি সিমেন্ট পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেন্টমার্টিনের কাছে কোস্ট গার্ডের অভিযানে মিয়ানমারগামী দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ সময় ১৮ জনকে আটক করা হয়।
এর কয়েক দিন পর একই ধরনের আরেক অভিযানে ১ হাজার ১৪০ বস্তা সিমেন্টের পাশাপাশি রসুন, ছোলা, আলু ও ৭ হাজার ৮০টি এনার্জি ড্রিংক জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় ১৯ জনকে আটক করা হয়।
পরবর্তী সময়েও সিমেন্ট পাচারের একাধিক ঘটনা সামনে আসে। গত ২ জুন সেন্টমার্টিনের কাছে দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৭০০ বস্তা সিমেন্টসহ ২০ জনকে আটক করা হয়। অভিযোগ ছিল, বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সিমেন্টগুলো রাখাইনে নেওয়া হচ্ছিল।
এর মাত্র দুই দিন পর, ৪ জুন একই এলাকায় পাঁচটি মাছ ধরার নৌকা থেকে ১ হাজার ৪৫০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এ সময় ৫২ জনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা সিমেন্টগুলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে যে সিমেন্টের এক বস্তার দাম প্রায় ৫০০ টাকা, সেটিই রাখাইনে প্রায় ১ লাখ মিয়ানমার কিয়াটে বিক্রির তথ্য সামনে এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা।
দামের এই বড় পার্থক্যই পাচারকারীদের জন্য বাড়তি লাভের সুযোগ তৈরি করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও আটকের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও একটি চক্র সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সমুদ্রপথে মিয়ানমারে পাঠানোর চেষ্টা করছে।
শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পণ্যও এই অবৈধ বাণিজ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। চাল, ডাল, ছোলা, আলু, রসুন, জ্বালানি ও ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের সময় জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরসংলগ্ন গাংগুরিয়া চরে কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে একটি কার্গো বোট থেকে ২৪ হাজার কেজি ইউরিয়া সার, ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা এবং ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডাল জব্দ করে। এসব পণ্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে এলাকায় নেওয়ার কথা ছিল বলে জানা যায়।
ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সীমান্তের চোরাচালান এখন নির্দিষ্ট একটি পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওপারে যে পণ্যের চাহিদা বেশি, সেটিই পাচারকারীদের কাছে সম্ভাব্য লাভজনক পণ্য হয়ে উঠছে।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা বিকল্প রুট হিসেবে সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এখন মহেশখালী, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, আনোয়ারা ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় রুটও নজরদারির আওতায় এসেছে। মাছ ধরার নৌকা ও অন্যান্য ছোট নৌযান ব্যবহার করে এসব রুটে অবৈধ পণ্য পরিবহনের চেষ্টা চলছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য।
ফলে সীমান্তের অবৈধ অর্থনীতির পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে। আগে যেখানে টেকনাফ ও নাফ নদীকে প্রধান রুট হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেখানে বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চলও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, কোস্ট গার্ডের অভিযানে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্য মিয়ানমারে পাঠানোর পর বিনিময়ে মাদক দেশে আনার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের অভিযানে ইয়াবা ও আইসসহ বিভিন্ন মাদকও জব্দ হয়েছে বলে তিনি জানান।
তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক


