খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজমদ সরবরাহে নতুন নিয়ম! ডিস্ট্রিবিউটরদের বাড়তি সুবিধা বন্ধ, বাড়বে রাজ্যের রাজস্ব?

মদ সরবরাহে নতুন নিয়ম! ডিস্ট্রিবিউটরদের বাড়তি সুবিধা বন্ধ, বাড়বে রাজ্যের রাজস্ব?

এই বৈঠকে বিদেশি মদ (FL) এবং ভারতীয় তৈরি বিদেশি মদ (IML)-এর ডিস্ট্রিবিউটররা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রাজ্যের আবগারি কমিশনার এবং কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সভাপতিত্ব করেন।

পশ্চিমবঙ্গে মদ ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। আগামী ২৫ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন আবগারি শুল্ক নীতি, যার ফলে মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা, ব্রুয়ারি এবং বটলিং প্ল্যান্ট থেকে পণ্য সরানোর আগেই সম্পূর্ণ আবগারি শুল্ক ও অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক জমা দিতে হবে। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির পথও অনেকটাই বন্ধ করবে।

আগামী সোমবার রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করতে চলেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বাজেট ঘোষণার ঠিক আগে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের একাংশ।

এতদিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মদ সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বন্ডভিত্তিক হিসাব ব্যবস্থা চালু ছিল। সেই ব্যবস্থায় ডিস্ট্রিবিউটররা বাজারে পণ্য সরবরাহের পর অর্থ সংগ্রহ করে পরে সরকারের কাছে আবগারি শুল্ক জমা দিতেন। নতুন নিয়মে সেই সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এখন থেকে কোনও প্রস্তুতকারক সংস্থা বা ব্রুয়ারি থেকে মদ বাজারে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট আবগারি শুল্ক এবং অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, সরকার আগে কর পাবে, তারপর বাজারে পণ্য পৌঁছাবে।

প্রশাসনের মতে, এই পদ্ধতি চালু হলে রাজস্ব আদায় আরও দ্রুত হবে এবং শুল্ক বকেয়া থাকার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।

নতুন নীতি কার্যকর করার আগে শুক্রবার সল্টলেকের শুভান্ন ভবনে অবস্থিত ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেডের সদর দফতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকে বিদেশি মদ (FL) এবং ভারতীয় তৈরি বিদেশি মদ (IML)-এর ডিস্ট্রিবিউটররা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রাজ্যের আবগারি কমিশনার এবং কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সভাপতিত্ব করেন।

সেখানে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের রূপরেখা, কর প্রদানের পদ্ধতি এবং ডিস্ট্রিবিউটরদের করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ‘বন্ড ভ্যালু রেজিস্টার’ পদ্ধতির অবসান।

২৫ জুন থেকে এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। তার পরিবর্তে ডিস্ট্রিবিউটরদের ‘পার্সোনাল লেজার অ্যাকাউন্ট’ থেকে সরাসরি অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হবে।

এর ফলে আলাদা বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ বা জটিল হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন থাকবে না। সরকারের দাবি, এতে আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে।

নতুন নিয়ম চালুর আগে ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে ২১ জুন পর্যন্ত নতুন সেলস অর্ডার বা রিকুইজিশন জমা দেওয়া যাবে। এরপর পুরনো নিয়মে কোনও নতুন আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

এছাড়া ২২ জুনের পর কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নতুন ‘অর্ডার অফ সাপ্লাই’ জারি করা হবে না। ইতিমধ্যে ইস্যু হওয়া সমস্ত অর্ডারের সরবরাহ কার্যক্রম ২৪ জুন দুপুর ২টার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও অর্ডার কার্যকর না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

আবগারি দফতরের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক সংগ্রহ বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগ ছিল। নতুন নিয়মে পণ্য বাজারে ছাড়ার আগেই কর জমা হওয়ায় সেই সমস্যা দূর হবে।

পাশাপাশি পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার উপর সরকারের নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে। ফলে কর ফাঁকি, হিসাব গরমিল কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।

যদিও সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ, তবে মদ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটর প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাদের মতে, নতুন পদ্ধতিতে কাজ করতে গেলে ব্যাংক গ্যারান্টি, পার্সোনাল লেজার অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন আর্থিক নথি হালনাগাদ করতে হবে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

তবে সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে, পরিবর্তনের এই পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও বিঘ্ন ঘটতে দেওয়া হবে না।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই নিয়ম সম্পূর্ণ নতুন নয়। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একই ধরনের নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল।

সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, বিদেশ থেকে আমদানি করা মদ এবং দেশে উৎপাদিত বিলিতি মদ—উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পণ্য ছাড়ার আগে আবগারি ও অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।

কিন্তু ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেই নির্দেশিকা স্থগিত রাখা হয়। এবার বর্তমান সরকার সেই স্থগিত নির্দেশিকাকেই পুনরায় কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আবগারি দফতর সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড বা ‘বেভকো’-কে ঘিরে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

২০১৭ সালে সংস্থাটি গঠনের পর রাজ্যে মদের পাইকারি ব্যবসা প্রায় সম্পূর্ণভাবে এর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু ডিস্ট্রিবিউটর বিশেষ সুবিধা পেতেন।

পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় ডিস্ট্রিবিউটররা নিজেদের পুঁজি ব্যবহার না করেই বাজারে পণ্য বিক্রি করে পরে সরকারের শুল্ক পরিশোধ করতেন। ফলে কার্যত ব্যবসায়িক সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিলম্ব ঘটত।

নতুন নীতিতে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন থেকে ব্যবসায়ীদের নিজেদের অর্থেই আগাম শুল্ক মিটিয়ে পণ্য বাজারে আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে মদ ব্যবসার আর্থিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। ডিস্ট্রিবিউটরদের কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন বাড়বে, কারণ তাদের আগাম কর পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব প্রবাহ আরও নিয়মিত হবে। কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণও শক্তিশালী হবে।

দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি রাজ্যের আবগারি ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই।

আগামী ২৫ জুন থেকে কার্যকর হতে চলা পশ্চিমবঙ্গের নতুন আবগারি শুল্ক ব্যবস্থা মদ সরবরাহ ও বণ্টন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে চলেছে। অগ্রিম শুল্ক পরিশোধ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সরকার যেমন রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে চাইছে, তেমনি দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের পথও বন্ধ করার চেষ্টা করছে। ফলে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু মদ ব্যবসাতেই নয়, রাজ্যের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।