অবশেষে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় চার দিন ধরে আটকে থাকা দুই শিশুসন্তানসহ এক দম্পতির দুর্ভোগের অবসান হয়েছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন এবং সীমান্তজুড়ে টানটান উত্তেজনার পর বৃহস্পতিবার সকালে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে একই স্থানে অবস্থান করা আরও দুই যুবক এখনও শূন্যরেখাতেই রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় মানবিক সংকট, পুশইন ইস্যু এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চার দিনের চরম দুর্ভোগের পর শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে একটি গাড়ি সীমান্ত এলাকায় আসে। পরে সেই গাড়িতেই দুই শিশুসন্তানসহ দম্পতিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলে বিজিবির যানবাহনও ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
শৌলমারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ জহুরুল ইসলাম জানান, সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত পরিবারটিকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়রা প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছে বা পরবর্তীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট বিজিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চার দিন ধরে শূন্যরেখায় অবস্থানকালে স্থানীয় অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। কেউ খাবার, কেউ বিশুদ্ধ পানি, আবার কেউ রাত কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করেন।
গয়টাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল জানান, তিনি পরিবারটির জন্য একটি মশারি দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে সেটি আনতে গিয়ে দেখেন দম্পতি ও তাদের দুই সন্তান আর সেখানে নেই। তবে একই স্থানে এখনও দুই যুবক অবস্থান করছেন এবং পুরো এলাকাজুড়ে বিজিবি ও বিএসএফের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের এই সহমর্মিতা সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করেছে, বিজিবি ওই দম্পতিকে রৌমারী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে পুলিশ তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
তবে রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওছার আলী এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
ফলে পরিবারটির বর্তমান অবস্থান এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ জুন ভোরে। ওই দিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নারী ও শিশুসহ কয়েকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ ওঠে। গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ছয়জন এবং ইজলামারী সীমান্ত দিয়ে আরও তিনজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়।
কাঁটাতারের এপারে নিয়ে আসা হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে সীমান্তের শূন্যরেখার কাছেই তাদের অবস্থান করতে হয়।
এরপর টানা চার দিন তারা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করেন। সীমান্তের দুই বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ তাদের ঘিরে রাখে। শিশুদের নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে বসবাস করায় বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
শিশুসন্তানসহ আটকে পড়া দম্পতি নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন। তাদের পরিচয় অনুযায়ী, তারা সুমি আক্তার ও বেলাল হোসেন। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে তারা সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে ভারতের গোয়াহাটি এলাকায় পুলিশ তাদের আটক করে এবং বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর গত রবিবার ভোরে বিএসএফ তাদের সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়।
তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের বাধার কারণে তারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। এর ফলে পরিবারটিকে দীর্ঘ সময় শূন্যরেখায় অবস্থান করতে হয়।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন এবং মানবাধিকার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতি মানবিক উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।
দুই শিশুসন্তানসহ দম্পতিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও এখনও সীমান্তে অবস্থানরত অন্য দুই যুবকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

